ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ
"মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিজ্ঞানী, দার্শনিক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর অবদান এতটাই গভীর যে তাঁকে “জ্ঞানতাপস” নামে অভিহিত করা হয়। বাংলা ভাষার উৎপত্তি, ব্যাকরণ, আঞ্চলিক ভাষা ও মধ্যযুগীয় সাহিত্য নিয়ে তাঁর গবেষণা আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। তিনি শুধু একজন ভাষাবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে বহু ভাষার পণ্ডিত, চিন্তাবিদ এবং বাঙালি জাতিসত্তার এক নিবেদিতপ্রাণ সাধক। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তিনি সুস্পষ্ট মত প্রকাশ করেছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনের পেছনে তাঁর চিন্তা ও গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।"
একনজরে
- জন্ম
- মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১০ জুলাই ১৮৮৫
- মৃত্যু
- ১৩ জুলাই ১৯৬৯ (বয়স ৮৪)
- শিক্ষা
- পিএইচডি
- পেশা
- অধ্যাপনা
- আত্মীয়
- মুর্তজা বশীর (পুত্র) মারগুবা খাতুন (পত্নী)
- পুরস্কার
- স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৮০), একুশে পদক (২০০২),প্রাইড অব পারফরম্যান্স ও নাইট অব দি অর্ডারস অব আর্টস অ্যান্ড লেটার পদক
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
পরিচয়
মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিজ্ঞানী, দার্শনিক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর অবদান এতটাই গভীর যে তাঁকে “জ্ঞানতাপস” নামে অভিহিত করা হয়। বাংলা ভাষার উৎপত্তি, ব্যাকরণ, আঞ্চলিক ভাষা ও মধ্যযুগীয় সাহিত্য নিয়ে তাঁর গবেষণা আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
তিনি শুধু একজন ভাষাবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে বহু ভাষার পণ্ডিত, চিন্তাবিদ এবং বাঙালি জাতিসত্তার এক নিবেদিতপ্রাণ সাধক। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তিনি সুস্পষ্ট মত প্রকাশ করেছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনের পেছনে তাঁর চিন্তা ও গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মফিজউদ্দিন আহমদ এবং মাতার নাম হুরুন্নেসা। জন্মের সময় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল “মুহাম্মদ ইব্রাহিম”; পরে তাঁর মা “শহীদুল্লাহ” নামটি ব্যবহার করতে শুরু করেন এবং সেটিই স্থায়ী হয়ে যায়।
তাঁর পরিবার ছিল ধর্মীয় ও শিক্ষানুরাগী। ছোটবেলা থেকেই তিনি বই পড়া এবং ভাষা শেখার প্রতি গভীর আগ্রহ দেখান। পরবর্তীতে এই আগ্রহই তাঁকে বিশ্বখ্যাত ভাষাবিদে পরিণত করে। [ref].
শিক্ষাজীবন
শিক্ষাজীবনের শুরু গ্রামের পাঠশালায়। পরে তিনি হাওড়া জেলা স্কুলে ভর্তি হন। ছাত্রজীবনেই তিনি আরবি, ফার্সি, উর্দু, হিন্দি ও উড়িয়া ভাষা শেখেন। ভাষা শেখার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
১৯০৪ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং এফ.এ. সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্সসহ বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। মুসলিম সমাজের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি সংস্কৃতে অনার্স করেন।
তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপে যান। ফ্রান্সের বিখ্যাত সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল চর্যাপদের ভাষা।[ref].
ভাষাজ্ঞান ও পাণ্ডিত্য
ড. শহীদুল্লাহ ছিলেন সত্যিকারের বহুভাষাবিদ। বলা হয়, তিনি ১৮টিরও বেশি ভাষায় দক্ষ ছিলেন এবং আরও বহু ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান রাখতেন। বাংলা, সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি, উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, পালি ও তিব্বতি ভাষায় তাঁর অসাধারণ দখল ছিল।
ভাষা নিয়ে তাঁর গবেষণা ছিল গভীর ও বৈজ্ঞানিক। বাংলা ভাষার উৎপত্তি নিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মত প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, বাংলা ভাষার উৎপত্তি গৌড়ীয় প্রাকৃত বা মাগধী প্রাকৃত ভাষা থেকে হয়েছে। এই গবেষণা বাংলা ভাষাতত্ত্বে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
কর্মজীবন ও শিক্ষকতা
১৯২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্য ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সময় তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ওপর ব্যাপক গবেষণা করেন। তিনি শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতেন না; শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণার আগ্রহও সৃষ্টি করতেন।
অবসরের পরও তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বাংলা একাডেমির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।[ref].
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে অবদান
ড. শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষাকে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে কাজ করেন। তিনি বাংলা ব্যাকরণ, শব্দতত্ত্ব, আঞ্চলিক ভাষা ও মধ্যযুগীয় সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন।
তাঁর সম্পাদিত “বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান” বাংলা ভাষা গবেষণায় এক অনন্য সংযোজন। এই অভিধানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষা ও শব্দভাণ্ডার সংগ্রহ করা হয়েছিল।
তিনি চর্যাপদ নিয়ে গভীর গবেষণা করেন এবং প্রমাণ করেন যে চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নির্ধারণেও তাঁর গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রশ্নে তিনি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। পাকিস্তান আমলে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে মত দেন।[ref].
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ অসংখ্য গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- বাংলা সাহিত্যের কথা
- বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত
- বাংলা ব্যাকরণ
- ভাষা ও সাহিত্য
- বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান
- বৌদ্ধ মর্মবাণী
- বিদ্যাপতি শতক
- দেওয়ানে হাফিজ অনুবাদ
- রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম অনুবাদ
বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গবেষণার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তিনি বহু আগে থেকেই অনুভব করেছিলেন। বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার ধারণা প্রচারে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি “বাংলা একাডেমি” নামটিও তিনিই প্রথম ব্যবহার করেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
বাংলা পঞ্জিকার আধুনিকীকরণেও তাঁর বড় অবদান রয়েছে। বাংলা একাডেমির পঞ্জিকা সংস্কার কমিটির সভাপতি হিসেবে তিনি বাংলা তারিখ গণনাকে বিজ্ঞানসম্মত রূপ দেন। [ref].
ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাধারা
ড. শহীদুল্লাহ ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, জ্ঞানপিপাসু ও মানবতাবাদী মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন ভাষা একটি জাতির আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি। তাঁর লেখায় ধর্মীয় উদারতা, বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং জ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগ ফুটে ওঠে।
তিনি কখনো সংকীর্ণতা বা সাম্প্রদায়িকতাকে সমর্থন করেননি। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে তিনি সব মানুষের সম্পদ হিসেবে দেখতেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন। মৃত্যুর পরে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে। এছাড়া তিনি একুশে পদকেও ভূষিত হন।
মৃত্যু
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর গবেষণা, চিন্তাধারা ও ভাষাপ্রীতি আজও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় অনুপ্রেরণা জোগায়। তিনি বাংলা ভাষার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম হয়ে আছেন।