মুনীর চৌধুরী
"মুনীর চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, সাহিত্যসমালোচক ও ভাষা আন্দোলনের কর্মী। বাংলা নাটকের আধুনিক ধারার পথিকৃৎ হিসেবে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, ভাষাসৈনিক, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মী। তাঁর লেখায় মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক প্রতিবাদের শক্তিশালী প্রকাশ দেখা যায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী আলবদর বাহিনী তাঁকে হত্যা করে। এজন্য তিনি “শহীদ বুদ্ধিজীবী” হিসেবে চিরস্মরণীয়।"
একনজরে
- জন্ম
- আবু নয়ীম মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী ২৭ নভেম্বর ১৯২৫
- মৃত্যু
- ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ (বয়স ৪৬)
- পেশা
- নাট্যকার, প্রবন্ধকার
- জাতীয়তা
- ব্রিটিশ ভারতীয়
- নাগরিকত্ব
- ব্রিটিশ ভারত
- শিক্ষা
- কলাবিদ্যায় স্নাতকোত্তর (ভাষাতত্ত্ব)
- দাম্পত্যসঙ্গী
- লিলি চৌধুরী
- সন্তান
- আহমেদ মুনীর আশফাক মুনীর আসিফ মুনীর
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
পরিচয়
মুনীর চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, সাহিত্যসমালোচক ও ভাষা আন্দোলনের কর্মী। বাংলা নাটকের আধুনিক ধারার পথিকৃৎ হিসেবে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।
তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, ভাষাসৈনিক, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মী। তাঁর লেখায় মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক প্রতিবাদের শক্তিশালী প্রকাশ দেখা যায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী আলবদর বাহিনী তাঁকে হত্যা করে। এজন্য তিনি “শহীদ বুদ্ধিজীবী” হিসেবে চিরস্মরণীয়।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
মুনীর চৌধুরীর পূর্ণ নাম ছিল আবু নঈম মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। তিনি ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের আদি বাড়ি ছিল নোয়াখালীর চাটখিলে।
তাঁর পিতা খান বাহাদুর আবদুল হালিম চৌধুরী ছিলেন ব্রিটিশ আমলের একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। মাতা ছিলেন উম্মে কবির আফিয়া বেগম। পরিবারটি ছিল অত্যন্ত শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা।
জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ছিলেন তাঁর বড় ভাই এবং অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার তাঁর বোন।
শিক্ষাজীবন
তিনি ১৯৪১ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইএসসি সম্পন্ন করেন।
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বামপন্থী রাজনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তিনি কারাবন্দি হন। জেলে থাকা অবস্থায় তিনি বাংলা সাহিত্যে এমএ পরীক্ষায় অংশ নেন এবং প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরে ১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের Harvard University থেকে ভাষাবিজ্ঞানে আরেকটি মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। [ref].
শিক্ষকতা জীবন
মুনীর চৌধুরী শিক্ষক হিসেবে অসাধারণ জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি প্রথমে খুলনার ব্রজলাল কলেজে শিক্ষকতা করেন। পরে জগন্নাথ কলেজে এবং এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন।
তিনি ইংরেজি ও বাংলা—দুই বিভাগেই শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর বক্তৃতা ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও গভীর চিন্তাসমৃদ্ধ। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা পর্যন্ত তাঁর ক্লাস শুনতে আসতেন।
১৯৭১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন ছিলেন।[ref] .
ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন করায় পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
কারাগারে থাকাকালীন তিনি লেখেন তাঁর বিখ্যাত নাটক—
কবর
কবর বাংলা ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা এক ঐতিহাসিক নাটক। এটি বাংলা নাট্যসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নাটক হিসেবে বিবেচিত।
এই নাটকে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগ ও বাঙালির সংগ্রামী চেতনা প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলা নাটকে অবদান
মুনীর চৌধুরীকে বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা নাটকের অন্যতম জনক বলা হয়। তাঁর নাটকে ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজবাস্তবতা ও মানুষের মানসিক দ্বন্দ্ব অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে উঠে এসেছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- কবর
- রক্তাক্ত প্রান্তর
- চিঠি
- পলাশী ব্যারাক ও অন্যান্য
- একতলা দোতলা
বিশেষ করে রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকে তিনি ইতিহাসের ভেতর দিয়ে ক্ষমতা, যুদ্ধ ও মানুষের ট্র্যাজেডি তুলে ধরেছেন।
বাংলা টাইপরাইটার কিবোর্ড
মুনীর চৌধুরীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল বাংলা টাইপরাইটারের কিবোর্ড আধুনিকীকরণ। তিনি Remington কোম্পানির সঙ্গে কাজ করে বাংলা টাইপরাইটারের একটি উন্নত কিবোর্ড তৈরি করেন।
এই কিবোর্ড “Munier Optima” নামে পরিচিত হয়। বাংলা টাইপ প্রযুক্তির উন্নয়নে এটি ঐতিহাসিক অবদান হিসেবে বিবেচিত।[ref] .
মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ বুদ্ধিজীবী
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন। পাকিস্তানি সামরিক শাসন ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন ও কথা বলেছেন।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর, বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে, আলবদর বাহিনী তাঁকে ঢাকা থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এরপর তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
তিনি বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম প্রতীক হয়ে আছেন। [ref].
ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাধারা
মুনীর চৌধুরী ছিলেন যুক্তিবাদী, অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী চিন্তার মানুষ। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতার বিরোধিতা করতেন।
তাঁর সাহিত্য ও বক্তৃতায় মুক্তচিন্তা, ভাষাপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধের শক্তিশালী প্রকাশ দেখা যায়।
তিনি বিশ্বাস করতেন—
“ভাষা ও সংস্কৃতিই জাতির আত্মপরিচয়ের মূল শক্তি।”
পুরস্কার ও সম্মাননা
বাংলা সাহিত্য ও নাটকে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। স্বাধীনতার পর তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারেও ভূষিত করা হয়। [ref].
পরিবার ও উত্তরসূরি
তাঁর সন্তানদের মধ্যে মিশুক মুনীর বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ছিলেন। মিশুক মুনীরও ২০১১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন।