Bio.bd Logo
নীলিমা ইব্রাহিম
school শিক্ষাবিদ

নীলিমা ইব্রাহিম

"নীলিমা ইব্রাহিম ছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, গবেষক, সমাজকর্মী ও নারীজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি বাংলা সাহিত্য, নাট্যগবেষণা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং নারী পুনর্বাসন আন্দোলনে অসামান্য অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে লেখা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আমি বীরাঙ্গনা বলছি বাংলা সাহিত্যে ও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য দলিল হিসেবে বিবেচিত। তিনি ছিলেন সাহসী, মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ।"

edit_calendar 13 May, 2026 update আপডেট: 23 Jun, 2026 visibility 31

একনজরে

জন্ম
নীলিমা রায় চৌধুরী ১১ অক্টোবর ১৯২১
মৃত্যু
১৮ জুন ২০০২ (বয়স ৮০)
জাতীয়তা
বাংলাদেশী
শিক্ষা
পিএইচডি (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য)
পেশা
লেখিকা, শিক্ষাবিদ
দাম্পত্য সঙ্গী
মোহাম্মদ ইব্রাহিম (বি. ১৯৪৫)
সন্তান
৫, হাজেরা মাহতাব, ডলি আনোয়ার, কিশোয়ারা আজাদ
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more

পরিচয়

নীলিমা ইব্রাহিম ছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, গবেষক, সমাজকর্মী ও নারীজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি বাংলা সাহিত্য, নাট্যগবেষণা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং নারী পুনর্বাসন আন্দোলনে অসামান্য অবদান রেখেছেন।

বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে লেখা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আমি বীরাঙ্গনা বলছি বাংলা সাহিত্যে ও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য দলিল হিসেবে বিবেচিত। তিনি ছিলেন সাহসী, মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ।

জন্ম ও শৈশব

নীলিমা ইব্রাহিমের জন্ম ১৯২১ সালের ১১ অক্টোবর বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার মূলঘর গ্রামে। তাঁর জন্মনাম ছিল নীলিমা রায় চৌধুরী। পিতা প্রফুল্ল কুমার রায় চৌধুরী এবং মাতা কুসুম কুমারী দেবী।

তিনি একটি শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা পরিবারে বড় হন। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য, নাটক ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। পারিবারিক পরিবেশ তাঁর মানসিক ও সাহিত্যিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।[ref] .

শিক্ষাজীবন

তিনি খুলনা করনেশন গার্লস স্কুল থেকে স্কুলজীবন সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতার ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনা করেন।

এরপর স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৯৪৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন।

পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা নাটক ও সমাজচিত্র। [ref].

দাম্পত্য জীবন

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তাঁর পরিচয় হয় চিকিৎসক মোহাম্মদ ইব্রাহিম-এর সঙ্গে। পরে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

বিয়ের পর তিনি “নীলিমা ইব্রাহিম” নামে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁদের পাঁচ কন্যা সন্তান ছিল। তাঁদের পরিবার বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতিজগতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। [ref].

শিক্ষকতা ও একাডেমিক জীবন

১৯৫৬ সালে নীলিমা ইব্রাহিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হন।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার চর্চা গড়ে তুলতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তিনি রোকেয়া হলের প্রভোস্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং নারীশিক্ষার প্রসারে কাজ করেন।

বাংলা একাডেমি ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা

১৯৭৪-৭৫ সালে তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও গবেষণার বিকাশে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আন্দোলন, সাহিত্যসভা ও নারী সংগঠনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। [ref].

মুক্তিযুদ্ধ ও বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নীলিমা ইব্রাহিমের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেন এবং স্বাধীনতার পর নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের গঠিত নারী পুনর্বাসন বোর্ডের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। এই কাজের মাধ্যমে তিনি যুদ্ধের সময় নির্যাতনের শিকার বহু নারীর জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা কাছ থেকে জানতে পারেন। [ref].

“আমি বীরাঙ্গনা বলছি”

নীলিমা ইব্রাহিমের সবচেয়ে বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক গ্রন্থ হলো—

আমি বীরাঙ্গনা বলছি

এই বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে নির্যাতিত নারীদের বাস্তব কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীলতা ও মানবিকতার সঙ্গে বীরাঙ্গনাদের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেন। বইটি শুধু সাহিত্য নয়; বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও বিবেচিত।

এই গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি সমাজের সামনে যুদ্ধাহত নারীদের বেদনা, সংগ্রাম ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন তুলে ধরেন। [ref].

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ

নীলিমা ইব্রাহিমের সাহিত্য ও গবেষণাধর্মী কাজ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • আমি বীরাঙ্গনা বলছি
  • ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি সমাজ ও বাংলা নাটক
  • বাংলা নাটক : উৎস ও ধারা
  • শরৎ প্রতিভা
  • বাংলার কবি মধুসূদন
  • বাঙালি মানস ও বাংলা সাহিত্য
  • সাহিত্য সংস্কৃতির নানা প্রসঙ্গ
  • বিশ শতকের মেয়ে
  • এক পথ দুই বাঁক

নারীজাগরণ ও সমাজচিন্তা

নীলিমা ইব্রাহিম নারীর স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও শিক্ষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর লেখায় নারীর মানসিকতা, সামাজিক বৈষম্য ও আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে।

তবে তিনি কেবল নারীবাদী পরিচয়ে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে নারী-পুরুষের সমান মর্যাদার কথা বলেছেন।

জাতীয় শিশু দিবস প্রস্তাব

১৯৯৩ সালে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন ১৭ মার্চকে “জাতীয় শিশু দিবস” হিসেবে পালনের প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশে এটি জাতীয়ভাবে পালিত হতে শুরু করে।

পুরস্কার ও সম্মাননা

সাহিত্য, শিক্ষা ও সমাজসেবায় অবদানের জন্য তিনি বহু সম্মাননা লাভ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৯)
  • একুশে পদক (২০০০)
  • স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর, ২০১১) [ref].

ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাধারা

নীলিমা ইব্রাহিম ছিলেন দৃঢ়চেতা, মানবিক ও প্রগতিশীল মানুষ। তিনি সত্য, ন্যায় ও মানবিক মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন।

তাঁর লেখায় যেমন গবেষণার গভীরতা ছিল, তেমনি ছিল মানুষের প্রতি গভীর সহমর্মিতা। তিনি বিশ্বাস করতেন—

“শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমেই সমাজের প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব।”

মৃত্যু

নীলিমা ইব্রাহিম ২০০২ সালের ১৮ জুন ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে।

জীবনীটি শেয়ার করুন

এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পটি অন্যদের সাথে ছড়িয়ে দিন।

Facebook WhatsApp