জাহানারা ইমাম
"জাহানারা ইমাম ছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখিকা, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী ও একাত্তরের ঘাতক-দালালবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী। তিনি “শহীদ জননী” নামে সমগ্র বাংলাদেশে পরিচিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী চেতনার লড়াই এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ একাত্তরের দিনগুলি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দলিল হিসেবে বিবেচিত।"
একনজরে
- জন্ম
- মে ৩ ১৯২৯
- মৃত্যু
- ২৬ জুন ১৯৯৪ (বয়স ৬৫) ডেট্রয়েট, মিশিগান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
- মৃত্যুর কারণ
- ক্যান্সার
- অন্যান্য নাম
- শহীদ জননী
- পেশা
- শিক্ষকতা, প্রভাষক
- পরিচিতির কারণ
- সাহিত্যিক ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল আন্দোলনের নেত্রী
- দাম্পত্য সঙ্গী
- শরীফ ইমাম
- সন্তান
- শাফী ইমাম রুমী সাইফ ইমাম জামী
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
পরিচয়
জাহানারা ইমাম ছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখিকা, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী ও একাত্তরের ঘাতক-দালালবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী। তিনি “শহীদ জননী” নামে সমগ্র বাংলাদেশে পরিচিত।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী চেতনার লড়াই এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ একাত্তরের দিনগুলি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দলিল হিসেবে বিবেচিত।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
জাহানারা ইমামের জন্ম ১৯২৯ সালের ৩ মে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে। তাঁর ডাকনাম ছিল “জুড়ু”।
পিতা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন ব্রিটিশ আমলের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং মাতা সৈয়দা হামিদা বেগম ছিলেন শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা নারী। পরিবারটি ছিল রক্ষণশীল মুসলিম পরিবার হলেও তাঁর বাবা মেয়েদের আধুনিক শিক্ষায় উৎসাহ দিতেন।[ref] .
শিক্ষাজীবন
জাহানারা ইমাম ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ১৯৪২ সালে তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
পরে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে কলকাতার Lady Brabourne College-এ ভর্তি হন এবং ১৯৪৭ সালে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশভাগের পর তিনি পূর্ববাংলায় চলে আসেন।
পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড ও বাংলায় এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। [ref].
শিক্ষকতা জীবন
জাহানারা ইমামের কর্মজীবনের শুরু শিক্ষকতা দিয়ে। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি কাজ করেছেন—
- বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
- সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুল
- বুলবুল একাডেমি
- ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ
এছাড়া তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটেও খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। [ref].
দাম্পত্য জীবন ও পরিবার
তিনি প্রখ্যাত স্থপতি শরীফ ইমাম-কে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই ছেলে ছিল—
- শাফী ইমাম রুমী
- সাইফ ইমাম জামী
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বড় ছেলে রুমী গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে শহীদ হন। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই জাহানারা ইমাম “শহীদ জননী” হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ জাহানারা ইমামের জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
তাঁর ছেলে রুমী মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলে তিনি তাকে বাধা দেননি। বরং দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের প্রেরণা দিয়েছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী রুমীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি আর ফিরে আসেননি।
একই সময়ে তাঁর স্বামীও মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং পরে মৃত্যুবরণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ের অভিজ্ঞতা, ভয়, আশা, শোক ও প্রতিরোধের কথা তিনি ডায়েরিতে লিখে রাখেন। সেই ডায়েরিই পরে একাত্তরের দিনগুলি নামে প্রকাশিত হয়।
“একাত্তরের দিনগুলি”
জাহানারা ইমামের সবচেয়ে বিখ্যাত বই হলো—
একাত্তরের দিনগুলি
এই বইটি মুক্তিযুদ্ধের সময় লেখা দিনলিপি। এখানে যুদ্ধকালীন ঢাকার জীবন, পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস এবং একজন মায়ের ব্যক্তিগত বেদনা অত্যন্ত জীবন্তভাবে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা বইগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় গ্রন্থগুলোর একটি। বইটি শুধু সাহিত্য নয়; এটি ইতিহাসেরও মূল্যবান দলিল। [ref].
ঘাতক-দালাল নির্মূল আন্দোলন
স্বাধীনতার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়ায় জাহানারা ইমাম গভীরভাবে ব্যথিত হন।
১৯৯২ সালে তিনি “একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি”-এর আহ্বায়ক হন। তাঁর নেতৃত্বে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে “গণআদালত” অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের প্রতীকী বিচার করা হয়।
4
এই আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করেন।
তাঁর নেতৃত্বে গণস্বাক্ষর, মানববন্ধন, সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনর্জাগরণের চেষ্টা করা হয়।
সাহিত্যচর্চা
জাহানারা ইমাম শুধু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক লেখকই ছিলেন না; তিনি শিশু সাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্য ও উপন্যাসও লিখেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- একাত্তরের দিনগুলি
- বীরশ্রেষ্ঠ
- বিদায় দে মা ঘুরে আসি
- গজকচ্ছপ
- সাতটি তারার ঝিকিমিকি
তাঁর লেখায় দেশপ্রেম, মানবিকতা, সংগ্রাম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। .
ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাধারা
জাহানারা ইমাম ছিলেন সাহসী, মানবিক ও আপসহীন মানুষ।
তিনি বিশ্বাস করতেন—
“মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষা করা জাতির দায়িত্ব।”
তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে শুধু রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে নয়, বরং নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতেন।
অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েও রাজপথ ছাড়েননি।
মৃত্যু
আশির দশকে তিনি মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের ডেট্রয়েটে মৃত্যুবরণ করেন।
পরে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে আনা হয় এবং মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
পুরস্কার ও সম্মাননা
সাহিত্য ও জাতীয় জীবনে অবদানের জন্য তিনি বহু সম্মাননা লাভ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১)
- স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর, ১৯৯৭)
- রোকেয়া পদক
- অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার