বদরুদ্দীন উমর
"বদরুদ্দীন উমর বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী, ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক। তিনি বিশেষভাবে পরিচিত মার্কসবাদী বিশ্লেষণ, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসচর্চা, সমাজ-রাজনীতি বিশ্লেষণ এবং সাংস্কৃতিক সমালোচনার জন্য। বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু লেখক ছিলেন না; বরং একজন সক্রিয় রাজনৈতিক চিন্তক, যিনি সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর লেখায় যুক্তিবাদ, শ্রেণিচেতনা ও সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।"
একনজরে
- জন্ম
- বদরুদ্দীন উমর ২০ ডিসেম্বর ১৯৩১
- মৃত্যু
- ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ (বয়স ৯৩) ঢাকা, বাংলাদেশ
- জাতীয়তা
- বাংলাদেশি
- সন্তান
- ২ মেয়ে ও ২ ছেলে
- পেশা
- মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, অধ্যাপক, লেখক, ইতিহাসবিদ
- পুরস্কার
- স্বাধীনতা পুরস্কার (২০২৫)
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
পরিচয়
বদরুদ্দীন উমর বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী, ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক। তিনি বিশেষভাবে পরিচিত মার্কসবাদী বিশ্লেষণ, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসচর্চা, সমাজ-রাজনীতি বিশ্লেষণ এবং সাংস্কৃতিক সমালোচনার জন্য।
বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু লেখক ছিলেন না; বরং একজন সক্রিয় রাজনৈতিক চিন্তক, যিনি সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর লেখায় যুক্তিবাদ, শ্রেণিচেতনা ও সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
বদরুদ্দীন উমরের পূর্ণ নাম বদরুদ্দীন মোহাম্মদ উমর। তিনি ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বর্ধমান শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা আবুল হাশিম ছিলেন উপমহাদেশের একজন বিশিষ্ট মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ এবং বঙ্গীয় মুসলিম লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। মাতা মাহমুদা আখতার মেহেরবানু বেগম।
পরিবারের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তাঁর চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজচিন্তার প্রতি আকৃষ্ট হন।[ref].
শিক্ষাজীবন
তিনি বর্ধমান টাউন স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করেন। পরে বর্ধমান রাজ কলেজে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ দর্শন বিভাগে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরে তিনি যুক্তরাজ্যের University of Oxford থেকে Philosophy, Politics and Economics (PPE) বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। এই শিক্ষা তাঁর রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তাকে আরও গভীর করে তোলে।
শিক্ষকতা ও একাডেমিক জীবন
বদরুদ্দীন উমর কর্মজীবনের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। পরে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।
১৯৫৭ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-এ যোগ দেন। সেখানে তিনি দর্শন বিভাগে শিক্ষকতা করেন এবং পরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬৩ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হন। সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর বড় ভূমিকা ছিল।
রাজনৈতিক চিন্তা ও মার্কসবাদ
বদরুদ্দীন উমর মূলত একজন মার্কসবাদী চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত। তিনি সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে শ্রেণিভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন।
তিনি মনে করতেন—
সমাজের বৈষম্য ও শোষণ দূর করতে হলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন প্রয়োজন।
ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে তাঁর লেখাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।[ref] .
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসচর্চা
বদরুদ্দীন উমরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ—
পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি
এই বইটি তিন খণ্ডে প্রকাশিত হয় এবং ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রামাণ্য ইতিহাস হিসেবে বিবেচিত।
তিনি শুধু ঘটনাবলি বর্ণনা করেননি; বরং ভাষা আন্দোলনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পটভূমিও বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষক ও ইতিহাসবিদদের কাছে এই গ্রন্থ অত্যন্ত মূল্যবান।[ref] .
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
বদরুদ্দীন উমরের রচনাসম্ভার অত্যন্ত বিস্তৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- সাম্প্রদায়িকতা
- সংস্কৃতির সংকট
- সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা
- পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি
- চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাংলাদেশের কৃষক
- বাংলাদেশে মার্কসবাদ
- বাংলাদেশে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার
- আমার জীবন
- আমার পিতা
সমাজ ও সংস্কৃতিচিন্তা
বদরুদ্দীন উমর সমাজ ও সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে বিশ্লেষণ করতেন। তিনি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, সাংস্কৃতিক সংকীর্ণতা ও শোষণব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন।
তাঁর মতে, সংস্কৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, রাজনীতি ও শ্রেণিসম্পর্কের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ, রাষ্ট্রনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ বিশেষভাবে আলোচিত।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড
তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে কমিউনিস্ট রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেন এবং কৃষক-শ্রমিকের অধিকার নিয়ে আন্দোলনে অংশ নেন।
তিনি দীর্ঘদিন “সংস্কৃতি” নামে একটি রাজনৈতিক সাময়িকী সম্পাদনা করেন, যা বামপন্থী চিন্তা ও বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম ছিল। [ref].
ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাধারা
বদরুদ্দীন উমর ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টভাষী, যুক্তিনির্ভর ও আপসহীন চিন্তাবিদ। তিনি জনপ্রিয়তার চেয়ে সত্য ও যুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
তিনি ধর্ম, রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন এবং সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন। এজন্য তিনি যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি বিতর্কের মুখেও পড়েছেন।
তবে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে তাঁর প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।