শেখ হাসিনা
"শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং পুনরায় ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।"
একনজরে
- জন্ম
- ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭
- জন্মস্থান
- টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ
- পিতা
- শেখ মুজিবুর রহমান
- মাতা
- বেগম ফজিলাতুন নেসা মুজিব
- স্বামী
- ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া
- সন্তান
- সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ হোসেন
- ধর্ম
- ইসলাম
- শিক্ষা
- প্রাথমিক (আজিমপুর গার্লস স্কুল, ঢাকা) / কলেজ (ইডেন মহিলা কলেজ) / বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩)
- রাজনৈতিক তথ্য
- দল (বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ) / দলীয় সভানেত্রী ১৯৮১ – বর্তমান / প্রধানমন্ত্রী (১৯৯৬–২০০১) (২০০৯–২০২৪)
- উল্লেখযোগ্য অর্জন
- UNESCO শান্তি পুরস্কার (১৯৯৮) / মাদার তেরেসা পুরস্কার (১৯৯৮) / MK Gandhi Award (১৯৯৮) / TIME ১০০ প্রভাবশালী (২০১৮) / Forbes ১০০ ক্ষমতাধর নারী (২০১৫, ২০১৮, ২০২২)
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
শেখ হাসিনা ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং মাতা বেগম ফজিলাতুন নেসা মুজিব। তিনি পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় — তিন ভাই শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল এবং এক বোন শেখ রেহানা।
শৈশবে হাসিনা টুঙ্গিপাড়ায় মা ও দাদির কাছে বড় হন। পরিবারটি ষাটের দশকে ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে নির্মিত বাড়িতে চলে আসে। তাঁর শৈশব কেটেছে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে, কারণ বাবা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কারণে বারবার কারাবন্দি হতেন।[ref]
শিক্ষাজীবন ও ছাত্ররাজনীতি
শেখ হাসিনার শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঢাকার আজিমপুর গার্লস স্কুলে। পরে তিনি ইডেন মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন এবং ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন হাসিনা আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং রোকেয়া হল ইউনিটের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক তাঁর বাবার কারাবাসের সময় তিনি রাজনৈতিক যোগাযোগরক্ষাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।[ref]
বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
১৯৬৮ সালে হাসিনা বিখ্যাত বাংলাদেশি পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়াকে বিবাহ করেন। এই দম্পতির দুই সন্তান — পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় (ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক) এবং কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন (অটিজম অধিকারকর্মী)।[ref]
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হাসিনাকে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁর মা, ভাই-বোন ও স্বামীসহ গৃহবন্দি করে রাখে। সেই কঠিন সময়ে তিনি একজন তরুণ মা হিসেবে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিন পার করেন।
১৯৭৫ সালের ট্র্যাজেডি ও নির্বাসন
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক কর্মকর্তারা হাসিনার বাবা, মা ও তিন ভাইকে তাদের ঢাকার বাড়িতে নির্মমভাবে হত্যা করে। সে সময় হাসিনা তাঁর স্বামীর সঙ্গে পশ্চিম জার্মানিতে ছিলেন বলে বেঁচে যান। তাঁর বোন শেখ রেহানাও বিদেশে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান এবং সেখান থেকে ১৯৮০ সালে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন।[ref]
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আগমন
১৯৮১ সালে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় হাসিনাকে সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত করা হয়। একই বছরের ১৭ মে দীর্ঘ ছয় বছর নির্বাসন শেষে তিনি দেশে ফেরেন।
১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে তাঁকে বেশ কয়েকবার গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে তিন আসনে জয়ী হয়ে তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হন। ১৯৯০ সালে তাঁর নেতৃত্বে গণআন্দোলন তীব্র রূপ নেয় এবং স্বৈরশাসক এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।[ref]
প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্ব (১৯৯৬–২০০১)
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন এবং সম্পূর্ণ পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। এই মেয়াদে তাঁর সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে ছিল ভারতের সঙ্গে ৩০ বছরের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি এবং যমুনা সেতু (বঙ্গবন্ধু সেতু) নির্মাণ। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে তিনি বিরোধী দলে চলে যান।[ref]
দ্বিতীয় দফা ও পরবর্তী শাসনকাল (২০০৯–২০২৪)
২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক বিজয় পায় এবং ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনা পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এই মেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন ১১,০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং পাঁচ কোটি মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উঠে আসে। এরপর ২০১৪ ও ২০১৯ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি টানা ক্ষমতায় থাকেন।
পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
শেখ হাসিনাকে ১৯৯৮ সালে UNESCO-র হুফুয়েত-বোয়াগনি শান্তি পুরস্কার, মাদার তেরেসা পুরস্কার এবং MK গান্ধী পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০১৮ সালে TIME ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় এবং ২০১৫, ২০১৮ ও ২০২২ সালে Forbes-এর ১০০ ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় তাঁর নাম স্থান পায়।
পদত্যাগ ও নির্বাসন (২০২৪)
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেল আনুমানিক ২টা ২৫ মিনিটে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং হেলিকপ্টারে বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ভারতে চলে যান। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া ছাত্র প্রতিবাদ ক্রমশ সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের তথ্যমতে, সরকারের দমন-পীড়নে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।[ref]
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা ও মৃত্যুদণ্ড (২০২৫)
ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনে প্রাণঘাতী দমনপীড়নে ভূমিকার অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর প্রদত্ত এই রায়ে তাঁকে পাঁচটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয় — যার মধ্যে ছিল বিক্ষোভকারীদের হত্যার নির্দেশ প্রদান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহার করে জনগণের উপর মারণাস্ত্র প্রয়োগের আদেশ। হাসিনা এই রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বর্তমানে তিনি নয়াদিল্লিতে নির্বাসনে রয়েছেন। বাংলাদেশ তাঁকে ফেরত দেওয়ার জন্য ভারতকে বারবার অনুরোধ করলেও ভারত এখন পর্যন্ত প্রত্যর্পণে সাড়া দেয়নি।[ref]