তাজউদ্দিন আহমদ
"তাজউদ্দীন আহমদ (২৩ জুলাই ১৯২৫ — ৩ নভেম্বর ১৯৭৫) ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কেন্দ্রীয় নেতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরে মুক্তিযুদ্ধে যাঁর নাম সবচেয়ে অনিবার্যভাবে উচ্চারিত হয়, তিনি 'বঙ্গতাজ' তাজউদ্দীন আহমদ। নিজের নাম-যশের প্রতি বিন্দুমাত্র মোহ না রেখে শুধু দেশের জন্য নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এই মানুষটি ইতিহাসের এক বিরল অধ্যায়।"
একনজরে
- জন্ম
- ২৩ জুলাই ১৯২৫
- জন্মস্থান
- দরদরিয়া গ্রাম, কাপাসিয়া, গাজীপুর
- পিতা ও মাতা
- মৌলভী মো. ইয়াসিন খান ও মেহেরুন্নেসা খান
- স্ত্রী
- সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন
- সন্তান
- শারমিন আহমদ রিতি, সিমিন হোসেন রিমি, মাহজাবীন আহমদ মিমি, তানজিম আহমদ সোহেল তাজ
- শিক্ষা
- কালীগঞ্জ সেন্ট নিকোলাস ইনস্টিটিউশন; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (অর্থনীতি); আইন কলেজ
- পদ
- বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী (১৯৭১); অর্থমন্ত্রী (১৯৭২–৭৪)
- দল
- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
- পুরস্কার
- স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর)
- মৃত্যু
- ৩ নভেম্বর ১৯৭৫
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
ঢাকা থেকে প্রায় ৮২ কিলোমিটার দূরে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার দরদরিয়া গ্রামে জন্ম নেন তাজউদ্দীন আহমদ। পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে তিনি শৈশব থেকেই ছিলেন শান্ত, মিতভাষী ও দায়িত্বপরায়ণ।
বিস্ময়কর মেধার অধিকারী ছিলেন তিনি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াকালীনই অর্থনীতি, রাজনীতি, ভূগোল, যুদ্ধ ও মনীষীদের জীবনী মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাটটি বই পড়ে ফেলেছিলেন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় আইনের বিতর্ক শোনার আগ্রহে কোর্টে নিয়মিত যাতায়াত করতেন।
কালীগঞ্জ সেন্ট নিকোলাস ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে বিএ অনার্স শেষ করেন। পরে আইন কলেজে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।[ref]
রাজনীতিতে প্রবেশ ও আওয়ামী লীগ
১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। গণতান্ত্রিক যুবলীগেও নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় ছিলেন তিনি। মাত্র ২৮ বছর বয়সে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন।
১৯৫৫ সালে মাওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর কর্মনিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক নির্বাচিত করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি দলের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে উন্নীত হন। ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রণয়নেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।[ref]
২৫ মার্চের পর: সীমান্ত পেরিয়ে স্বাধীনতার পথে
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার পরদিন তাজউদ্দীন আহমদ আত্মগোপন করেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল প্রথমে আত্মরক্ষা, তারপর প্রস্তুতি, সবশেষে পাল্টা আক্রমণ। এই নীতিকে বাস্তবে রূপ দিতে একটি বৈধ সরকার গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
৩০ মার্চ সন্ধ্যায় ফরিদপুর-কুষ্টিয়া পথে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে পৌঁছান। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিদর্শক গোলক মজুমদার তাঁদের যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন।
ভারতের সীমান্তে পৌঁছে একটি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন তাজউদ্দীন — একটি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিনা প্রটোকলে অন্য দেশে প্রবেশ করা তাঁর দেশের জন্য অসম্মানজনক হবে। তাই ভারতীয় বাহিনী গার্ড অব অনার দিয়ে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর পরেই তিনি ভেতরে প্রবেশ করেন।
মুজিবনগর সরকার গঠন ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী
ভারতে পৌঁছে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকে তাজউদ্দীন নিজেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরেন এবং জানান যে ২৬ মার্চ থেকেই বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সরকার গঠন করেছে। ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে উপযুক্ত সময়ে স্বীকৃতি দেওয়ার আশ্বাস দেন।
১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে আনুষ্ঠানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শপথ নেয়। শপথের পর সাংবাদিকদের উদ্দেশে তাজউদ্দীন ঘোষণা করেন, সেই দিন থেকে মেহেরপুরের নতুন নাম হবে 'মুজিবনগর' — বঙ্গবন্ধুর নামে — এবং এটিই হবে বাংলাদেশের রাজধানী।
বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকাকালীন তাঁর নামেই পরিচালিত হয় মুক্তিযুদ্ধ। প্রবাসী এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ যুদ্ধের নয়টি মাস অক্লান্তভাবে নেতৃত্ব দেন আন্তর্জাতিক কূটনীতি, মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন ও রণকৌশল প্রণয়নে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
মুক্তিযুদ্ধে ভারত থেকে পরিচালিত হওয়ার সময় কলকাতার থিয়েটার রোডের একটি সাধারণ স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে থাকতেন তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েও বিলাসিতার ছিটেফোঁটা নেননি। ভারতে অবস্থানকালেও তাঁর ঘড়ি চলত বাংলাদেশি সময়ে ভারতীয় সময় থেকে ৩০ মিনিট এগিয়ে।[ref]
স্বাধীনতার পর: অর্থমন্ত্রী ও পদত্যাগ
বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে এলে তাজউদ্দীন আহমদ সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন। নতুন মন্ত্রিসভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেট পেশ করেন এবং প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
নীতির প্রশ্নে কখনো আপস না করায় শেষ পর্যন্ত দল ও সরকারের ভেতরে তাঁর অবস্থান কঠিন হয়ে পড়ে। ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন তাজউদ্দীন আহমদ।[ref]
কারাবন্দিত্ব ও জেলহত্যা
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে প্রথমে তাজউদ্দীন আহমদকে গৃহবন্দী এবং পরে ২৩ আগস্ট গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
৩ নভেম্বর ১৯৭৫ — ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে কুখ্যাত জেলহত্যার শিকার হয়ে প্রাণ হারান বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মুহম্মদ মনসুর আলী ও এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামান — আরও তিন জাতীয় নেতাকে একই রাতে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটি 'জেলহত্যা দিবস' হিসেবে চিহ্নিত।
ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র
তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বগুণ ছিল মোহনীয়। তাঁর আদর্শের প্রভাব মুহূর্তেই টেনে নিত দলীয় কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা থেকে সাধারণ মানুষকে। আজীবন আদর্শের প্রতি এমন অটল থাকার নজির ইতিহাসে বিরল।
অর্থনীতি ও আইনের ছাত্র হলেও বিশ্বইতিহাস ছিল তাঁর নখদর্পণে। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে সহকর্মীদের অনুপ্রাণিত করতে বলতেন, "আসুন এমনভাবে কাজ করি যেন ঐতিহাসিকরা আমাদের খুঁজতে কষ্ট পান" — নিজেকে আড়াল করে বাংলাদেশকে সামনে রাখার এই দর্শনই ছিল তাঁর জীবনের মূল সুর।
উত্তরাধিকার ও স্মরণ
তাঁর স্মরণে ঢাকায় শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মিত হয়েছে। মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। তাঁর কন্যা সিমিন হোসেন রিমি সংসদ সদস্য হিসেবে বাবার রাজনৈতিক আদর্শ বহন করেছেন। শারমিন আহমদ রিতি লিখেছেন তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা গ্রন্থ — যেখানে এক নেতার অন্তরের মানুষটিকে দেখা যায়।[ref]