শেখ মুজিবুর রহমান
"শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। তিনি “বঙ্গবন্ধু” নামে সমগ্র বাঙালি জাতির কাছে পরিচিত। তাঁর নেতৃত্ব, সাহস ও আত্মত্যাগ বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।"
একনজরে
- জন্ম
- ১৭ মার্চ ১৯২০
- জন্মস্থান
- টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ, বাংলাদেশ (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত)
- পিতা ও মাতা
- শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুন
- স্ত্রী
- শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব
- সন্তান
- ১. শেখ হাসিনা ২. শেখ কামাল ৩. শেখ জামাল ৪. শেখ রেহানা ৫. শেখ রাসেল
- পদ
- বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী
- দল
- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
- উপাধি
- বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা
- মৃত্যু
- ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, ঢাকা, বাংলাদেশ
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান এবং মাতার নাম সায়েরা খাতুন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহসী, মানবিক ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন ছিলেন।.
তিনি গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে অধ্যয়ন করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।[ref].
রাজনৈতিক জীবন
শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৬ সালে ঘোষিত তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে পরিচিত হয়।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে তাঁর দল আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। এর ফলে বাঙালিদের স্বাধীনতার আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।[ref]
ব্রিটিশ ভারতে রাজনৈতিক সক্রিয়তা
শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি গভীর আগ্রহ দেখান। ছোটবেলা থেকেই তিনি অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনোভাব গড়ে তোলেন। স্কুলে পড়ার সময় স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে শুরু করেন।
১৯৩৮ সালে গোপালগঞ্জ সফরে আসেন তৎকালীন বাংলার জনপ্রিয় নেতা শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ তরুণ শেখ মুজিবকে রাজনীতির প্রতি আরও অনুপ্রাণিত করে। বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দীর আদর্শ, নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলে।
পরবর্তীতে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়াশোনার সময় তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মুসলিম ছাত্রলীগের বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত হন এবং ছাত্রদের অধিকার আদায়ে কাজ করেন। সেই সময় তিনি একজন সাহসী ও জনপ্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৪৩ সালের ভয়াবহ বাংলার দুর্ভিক্ষে শেখ মুজিব সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ান। ক্ষুধার্ত ও অসহায় মানুষের সহায়তায় ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নেন। মানুষের কষ্ট ও দুঃখ খুব কাছ থেকে দেখার ফলে তাঁর মধ্যে মানবিকতা ও নেতৃত্বের গুণ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ও তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্যে কাজ করেন। ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন যে বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য শক্ত নেতৃত্বের প্রয়োজন। ব্রিটিশ শাসনামলের এই অভিজ্ঞতাগুলোই পরবর্তীতে তাঁকে বাঙালি জাতির অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে গড়ে তোলে। [ref].
পাকিস্তান আন্দোলন, যুক্তবঙ্গ ও দেশভাগ
১৯৪০-এর দশকে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে পাকিস্তান আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সে সময় শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং মুসলিম জনগণের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের পক্ষে কাজ করেন।
কলকাতায় অধ্যয়নের সময় তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রমে অংশ নেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মুসলমানদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক ঐক্য প্রয়োজন। এই সময় তিনি বিভিন্ন সভা, মিছিল ও প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে বাংলাকে বিভক্ত না করে একত্রে রাখার জন্য “যুক্তবঙ্গ” পরিকল্পনা উত্থাপন করা হয়। এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল একটি স্বাধীন ও অবিভক্ত বাংলা গঠন করা, যেখানে হিন্দু ও মুসলমান একসঙ্গে বসবাস করবে। শেখ মুজিব এই ধারণার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, কারণ তিনি বাংলার মানুষের ঐক্যে বিশ্বাস করতেন।
কিন্তু রাজনৈতিক মতবিরোধ, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও তৎকালীন পরিস্থিতির কারণে যুক্তবঙ্গ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। বাংলা বিভক্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ এবং পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশে পরিণত হয়।
দেশভাগের পর শেখ মুজিব পূর্ববাংলায় ফিরে আসেন এবং খুব দ্রুতই বুঝতে পারেন যে পূর্ববাংলার মানুষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এরপর থেকেই তিনি বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।[ref] .
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি বাঙালিদের স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর সেই অমর ঘোষণা—
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
এই ভাষণ বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য ঐক্যবদ্ধ করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালায়। সেই সময় শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পরে তাঁকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তাঁর আদর্শ ও নেতৃত্বে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। [ref].
স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক
স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেন। শিক্ষা, কৃষি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত্যু
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে তিনি সপরিবারে নিহত হন। এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শোকাবহ অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হয়।[ref]
উপসংহার
শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির আশা, সাহস ও স্বাধীনতার প্রতীক। তাঁর জীবনের সংগ্রাম আমাদের দেশপ্রেম, মানবতা ও নেতৃত্বের শিক্ষা দেয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।