একে ফজলুল হক
"আবুল কাশেম ফজলুল হক ছিলেন উপমহাদেশের একজন খ্যাতিমান রাজনৈতিক নেতা, যিনি “শেরে বাংলা” নামে সর্বাধিক পরিচিত। ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর জন্ম নেওয়া এই মহান নেতা ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার প্রথম ও দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালনকারী মুখ্যমন্ত্রীদের একজন ছিলেন। তিনি ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপনের মাধ্যমে পাকিস্তান আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।"
একনজরে
- জন্ম
- ২৬ অক্টোবর ১৮৭৩
- জন্মস্থান
- সাতুরিয়া, রাজাপুর, ঝালকাঠি (তৎকালীন বাকেরগঞ্জ), ব্রিটিশ ভারত
- পৈতৃক বাড়ি
- চাখার, বানারিপাড়া, বরিশাল
- মৃত্যু
- ২৭ এপ্রিল ১৯৬২, ঢাকা
- সমাধিস্থল
- তিন নেতার মাজার, ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ
- পিতা / মাতা
- কাজি মুহাম্মদ ওয়াজেদ / সাইদুন্নেসা খাতুন
- শিক্ষা
- প্রাথমিক: বরিশাল জিলা স্কুল (১৮৯০ সালে Entrance পাস) / স্নাতক: প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা (১৮৯৪) রসায়ন, গণিত ও পদার্থে ট্রিপল অনার্স / স্নাতকোত্তর: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণিত (১৮৯৬) / আইন: ইউনিভার্সিটি ল' কলেজ, কলকাতা (BL — ১৮৯৭)
- রাজনৈতিক পদ
- ১৯১৬–২১ সভাপতি, নিখিল ভারত মুসলিম লীগ / ১৯১৬–১৮ সাধারণ সম্পাদক, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস / ১৯২৪ শিক্ষামন্ত্রী, বেঙ্গল প্রদেশ / ১৯৩৫ মেয়র, কলকাতা (প্রথম মুসলিম মেয়র) / ১৯৩৭–৪৩ মুখ্যমন্ত্রী, অবিভক্ত বাংলা / ১৯৫৪ মুখ্যমন্ত্রী, পূর্ব বাংলা / ১৯৫৫–৫৬ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পাকিস্তান / ১৯৫৬–৫৮ গভর্নর, পূর্ব পাকিস্তান
- উল্লেখযোগ্য অবদান
- লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপন ১৯৪০ / কৃষক প্রজা পার্টি প্রতিষ্ঠা ১৯৩৬ / যুক্তফ্রন্ট গঠন ১৯৫৪ / বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা / ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অবদান / জমিদারি প্রথা বিলোপ আন্দোলন
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
আবুল কাশেম ফজলুল হক ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বাকেরগঞ্জ জেলার সাতুরিয়া গ্রামে তাঁর মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বরিশাল শহর থেকে ১৪ মাইল দূরে চাখার গ্রামে। তিনি ছিলেন কাজি মুহাম্মদ ওয়াজেদ ও সাইদুন্নেসা খাতুনের একমাত্র সন্তান। তাঁর বাবা বরিশাল বারের একজন সুপরিচিত দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনজীবী এবং দাদা কাজি আকরাম আলি আরবি ও ফারসি ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন।[ref]
শিক্ষাজীবন
শৈশবে আরবি ও ফারসিসহ ঐতিহ্যবাহী ইসলামি শিক্ষায় পারিবারিকভাবে দীক্ষিত হন। এরপর বরিশাল জিলা স্কুলে পড়াশোনা করে ১৮৯০ সালে Entrance পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় গিয়ে ১৮৯৪ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়ন, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে ট্রিপল অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে গণিতে স্নাতকোত্তর (১৮৯৬) এবং ১৮৯৭ সালে আইনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি এতটাই মেধাবী ছিলেন যে একটি পুরো পৃষ্ঠা একবার দেখলেই মুখস্থ করতে পারতেন।[ref]
কর্মজীবনের সূচনা
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি স্যার আশুতোষ মুখার্জির অধীনে আইন পেশায় শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করেন। বাবার মৃত্যুর পর বরিশালে আইন অনুশীলন এবং রাজচন্দ্র কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষকতাও করেন। ১৯০৮ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত সমবায় বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে সরকারি চাকরিতে থেকে পরে কলকাতা হাইকোর্ট বারে যোগ দেন।[ref]
রাজনীতিতে প্রবেশ
১৯১৩ সালে তিনি ঢাকা থেকে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে প্রথম নির্বাচিত হন এবং ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত টানা ২১ বছর কাউন্সিলে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৩ সালে ঢাকার নির্বাচনী এলাকায় রাই বাহাদুর মহেন্দ্রনাথ মিত্রকে পরাজিত করে কাউন্সিলে প্রবেশ করেন — এটি ছিল হিন্দু-অধ্যুষিত আসনে একজন মুসলিম প্রার্থীর বিরল জয়। ১৯১৯ সালে তিনি একই সময়ে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন — যা ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। তিনি অমৃতসর হত্যাকাণ্ড তদন্তের কংগ্রেস কমিটিতেও সদস্য ছিলেন।[ref]
কৃষক প্রজা পার্টি ও বাংলার মুখ্যমন্ত্রিত্ব (১৯৩৭–১৯৪৩)
১৯৩৭ সালের নির্বাচনের আগে ফজলুল হক নিষ্ক্রিয় প্রজা সমিতিকে পুনর্গঠন করে কৃষক প্রজা পার্টি (KPP) নামকরণ করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে কৃষকদের ঋণ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য তিনি একের পর এক আইন প্রণয়ন করেন। ১৯৩৮ সালে বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ডেটর্স অ্যাক্ট ও মানি লেন্ডার্স অ্যাক্ট পাস করে লক্ষ লক্ষ কৃষকের ঋণের বোঝা কমান এবং সুদের হার হ্রাস করেন। কৃষকদের হারানো জমি ফিরিয়ে দিতে সারা দেশে প্রায় ১১,০০০ ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করেন।[ref]
লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০) — ইতিহাসের মোড়
১৯৪০ সালে ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপন, যেখানে ব্রিটিশ ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বাঞ্চলীয় ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানানো হয়। জিন্নাহ বলেছিলেন, "যখন বাঘ এসেছে, মেষকে অবশ্যই পথ ছেড়ে দিতে হবে" — এই মন্তব্যেই ফজলুল হকের ব্যক্তিত্বের মাপ বোঝা যায়।
ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ফজলুল হক ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি কোনো আপস করেননি।
যুক্তফ্রন্ট ও পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী (১৯৫৪)
ফজলুল হক তাঁর কৃষক শ্রমিক পার্টি, মাওলানা ভাসানীর ন্যাপ ও শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে — মুসলিম লীগ চূর্ণ হয়ে মাত্র কয়েকটি আসন পায়। ফজলুল হক পাটুয়াখালিতে তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী খাজা নাজিমুদ্দিনকে পরাজিত করেন এবং মুখ্যমন্ত্রী হন। তাঁর সংক্ষিপ্ত মুখ্যমন্ত্রিত্বে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবদান
ফজলুল হক বাঙালি মুসলমানদের জন্য বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন — কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ, লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ, ঢাকার ইডেন গার্লস কলেজ ভবন, ফজলুল হক মুসলিম হল (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর নামে বা তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়ও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
ফজলুল হক ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে তিন নেতার মাজারে সমাহিত করা হয়, যেখানে পাশেই চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন খাজা নাজিমুদ্দিন ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। বাংলাদেশ সংসদ ভবন-সংলগ্ন এলাকাটি "শেরে বাংলা নগর" নামে পরিচিত। শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ ও শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামও তাঁর স্মৃতিতে নামাঙ্কিত।[ref]