আব্দুল হামিদ খান ভাসানী
"মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন উপমহাদেশের একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও জনমানুষের কণ্ঠস্বর। ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া এই মহান নেতা ব্রিটিশ শাসনামল, পাকিস্তান পর্ব এবং স্বাধীন বাংলাদেশ—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সময়েই সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেন। তিনি আওয়ামী লীগ-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। নিপীড়িত, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে আজীবন সংগ্রাম করায় মানুষ তাকে ভালোবেসে “মজলুম জননেতা” নামে সম্মানিত করে।"
একনজরে
- জন্ম
- ১২ ডিসেম্বর ১৮৮০
- জন্মস্থান
- ধানগড়া গ্রাম, সিরাজগঞ্জ, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি (বর্তমান বাংলাদেশ)
- মৃত্যু
- ১৭ নভেম্বর ১৯৭৬ (বয়স ৯৫–৯৬), ঢাকা
- সমাধিস্থল
- সন্তোষ, টাঙ্গাইল, বাংলাদেশ
- পিতা / মাতা
- হাজী শরাফত আলী খান / মোছাম্মৎ মজিরন বিবি
- স্ত্রী
- আলেমা খাতুন
- ধর্ম
- ইসলাম
- শিক্ষা
- মাদরাসাঃ স্থানীয় মাদরাসা, টাঙ্গাইল। উচ্চশিক্ষাঃ দারুল উলুম দেওবন্দ (১৯০৭–১৯০৯)
- উপাধি
- মজলুম জননেতা
- প্রতিষ্ঠিত দল
- আওয়ামী মুসলিম লীগ (১৯৪৯) / ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি — NAP (১৯৫৭)
- উল্লেখযোগ্য অবদান
- আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা ১৯৪৯ / ভাষা আন্দোলন সমর্থন ১৯৫২ / কাগমারী সম্মেলন ১৯৫৭ / ৬৯-এর গণআন্দোলন / ফারাক্কা লং মার্চ ১৯৭৬
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
ভাসানী সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রামে হাজী মোহাম্মদ শরাফত খান ও মজিরন্নেসা বিবির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি পিতামাতা হারান। পরিবারে পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি কনিষ্ঠ ছিলেন। শিশু অবস্থায়ই বাবা মারা যান, এবং কিছুদিন পর দুই ভাইসহ মাও মারা যান। বালক বয়সে তিনি ঢাকা থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে টাঙ্গাইলে চলে আসেন। সেখানে ধর্মীয় শিক্ষা সম্পন্ন করে মাওলানা উপাধি অর্জন করেন।[ref]
শিক্ষাজীবন
১৯০৭ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের বিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসায় পড়াশোনা করেন। তাঁর শিক্ষাজীবন মূলত স্বশিক্ষিত প্রকৃতির ছিল। দেওবন্দ থেকে ফেরার পর তিনি টাঙ্গাইলের কাগমারিতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। [ref]
রাজনৈতিক জীবনের সূচনা
১৯১৭ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনালিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে ভাসানীর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। মুহাম্মদ আলীর অনুপ্রেরণায় ১৯১৯ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। খিলাফত আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে দশ মাস কারাবাস করতে হয়। ১৯২৬ সালে বাংলা সরকার তাঁকে অবাঞ্ছিত ব্যক্তি ঘোষণা করলে তিনি আসামে চলে যান এবং সেখানে ঘাগমারিতে স্থায়ী হন — যে স্থানটি পরবর্তীতে তাঁর সম্মানে "হামিদাবাদ" নামে পরিচিত হয়।[ref]
আসামে কৃষক আন্দোলন ও "ভাসানী" নামের উৎপত্তি
ত্রিশের দশকের গোড়ায় ভাসানী আবারো আসামে ফিরে যান বাংলাদেশি মুসলিম কৃষকদের দুর্দশা লাঘবের উদ্দেশ্যে। ১৯৩৪ সালে তিনি মুসলিম লীগের আসাম শাখা প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর সভাপতি নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর ঐতিহাসিক অবস্থানের কারণে তিনি "ভাষান চরের মাওলানা" নামে পরিচিত হন এবং সেখান থেকেই তাঁর "ভাসানী" পদবির উৎপত্তি।[ref]
আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা (১৯৪৯)
১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের পর ভাসানী নতুন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাঁর কর্মপন্থা নির্ধারণ করেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন। শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক, আতাউর রহমান খান সহসভাপতি এবং তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি তিনি ঢাকা বার লাইব্রেরিতে "সর্বদলীয় ভাষা আন্দোলন কমিটি" গঠন করেন এবং বাংলাকে পাকিস্তানের জাতীয় ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন পরিচালনা করেন। ১৯৫৫ সালের ২১–২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি দলের নাম থেকে "মুসলিম" শব্দটি বাদ দিয়ে কেবল "আওয়ামী লীগ" রাখেন — এটি দলকে অসাম্প্রদায়িক চরিত্র দেয়।[ref]
কাগমারী সম্মেলন ও NAP প্রতিষ্ঠা (১৯৫৭)
১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাঙ্গাইলের কাগমারিতে ভাসানী একটি ঐতিহাসিক সম্মেলন আহ্বান করেন। সেখানে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানকে "আস-সালামু আলাইকুম" বলে বিদায় জানান — যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নের প্রতীকী ভাষ্য হয়ে ওঠে। ১৯৫৭ সালের ২৫ জুলাই তিনি আওয়ামী লীগ থেকে আলাদা হয়ে বামপন্থী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (NAP) গঠন করেন।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও স্বাধীনতার ডাক
১৯৬৯ সালে ভাসানী ঐতিহাসিক গণআন্দোলনকে নেতৃত্ব দেন, যা আইয়ুব খান সরকারের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৭০ সালের ২৩ নভেম্বর তিনি ঢাকার পল্টন ময়দানে প্রায় ৫০,০০০ মানুষের সমাবেশে "স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান" গঠনের ঘোষণা দেন এবং "স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ" স্লোগান দেন।[ref]
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ (১৯৭১)
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে সীমান্ত পার হতে গেলে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাঁকে আটকে দেয়। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের পর তাঁকে দেহরাদুনে আটক রাখা হয় এবং সমগ্র যুদ্ধকালে কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়। তবুও তিনি চীন ও রাশিয়াকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার আহ্বান জানান।[ref]
স্বাধীনতার পর রাজনীতি
১৯৭২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ভাসানী "হক কথা" নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন, যা আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সরব ছিল। পরে শেখ মুজিব এটি নিষিদ্ধ করেন। ভাসানী শেখ মুজিবকে একদলীয় রাষ্ট্র ও আজীবন প্রেসিডেন্ট হওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে মুজিব হত্যার খবর পেয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং নামাজের ঘরে প্রার্থনায় বসেন — কারণ মুজিবের প্রতি তাঁর ছিল এক পিতৃসুলভ স্নেহ।
ফারাক্কা লং মার্চ (১৯৭৬) — জীবনের শেষ মহাসংগ্রাম
১৯৭৬ সালের ১৬ মার্চ সকালে রাজশাহীর মাদরাসা ময়দানে বিশাল জনসমাবেশে ভাষণ দিয়ে তিনি ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চ শুরু করেন। লক্ষাধিক মানুষ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে কানসাট পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পায়ে হেঁটে যান। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে ভারত গঙ্গার পানি প্রবাহ নিজের দিকে সরিয়ে নেওয়ায় বাংলাদেশে পদ্মা শুকিয়ে মরুভূমির সৃষ্টি হচ্ছিল — এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিল এই মার্চ। এটি ছিল ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রথম বৃহৎ গণআন্দোলন। তখন থেকে প্রতিবছর ১৬ মে "ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস" পালিত হয়।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ৯৬ বছর বয়সে মাওলানা ভাসানী ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। লক্ষ লক্ষ বাঙালি শোকার্ত হয়ে পড়েন। তাঁকে টাঙ্গাইলের সন্তোষে সমাহিত করা হয়। ২০০৪ সালে BBC পরিচালিত "সর্বকালের সেরা বাঙালি" জরিপে তিনি ৮ম স্থান অর্জন করেন।[ref]
ব্যক্তিত্ব ও দর্শন
ভাসানী ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপনের মানুষ। তিনি সারাজীবন পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি পরতেন — কখনো স্যুট বা আধুনিক পোশাক পরেননি। শীতেও কোনো গরম কাপড় পরতেন না, শুধু একটি চাদর গায়ে জড়িয়ে থাকতেন। গান্ধীর মতো ভাসানীও প্রত্যক্ষ অহিংস আন্দোলনের পথ অনুসরণ করতেন এবং কখনো সরকারি ক্ষমতা গ্রহণ করেননি, যদিও তিনি আসাম, বেঙ্গল ও পূর্ব বাংলার পরিষদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।[ref]