Bio.bd Logo
শামসুর রাহমান
history_edu কবি

শামসুর রাহমান

"শামসুর রাহমান আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর। তিরিশের দশকের পাঁচ মহান কবির পর একমাত্র তিনিই বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষ হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। পুরনো ঢাকার গলি থেকে উঠে আসা এই নাগরিক কবি স্বৈরাচার ও পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে কলম তুলে ধরেছিলেন নির্ভীকভাবে। মুক্তিযুদ্ধকালে 'মজলুম আদিব' ছদ্মনামে লেখা তাঁর কবিতা কোটি বাঙালির প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের কবিজীবনে তিনি শতাধিক কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন, যা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।"

edit_calendar 06 May, 2026 update আপডেট: 22 Jun, 2026 visibility 33

একনজরে

জন্ম
২৩ অক্টোবর ১৯২৯
জন্মস্থান
৪৬ নং মাহুতটুলী, পুরান ঢাকা
পিতা / মাতা
মুখলেসুর রহমান চৌধুরী / আমেনা বেগম
শিক্ষা
পোগোজ স্কুল (ম্যাট্রিক ১৯৪৫), ঢাকা কলেজ (আইএ ১৯৪৭) । বিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৩)
পেশা ও কর্মজীবন
সাংবাদিক দৈনিক মর্নিং নিউজ (১৯৫৭) । দৈনিক বাংলার সম্পাদক
প্রথম কবিতা ও প্রথম কাব্যগ্রন্থ
উনিশশো উনপঞ্চাশ (১৯৪৩) । প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০)
বিবাহ
জোহরা বেগম (৮ জুলাই ১৯৫৫)
সন্তান
তিন মেয়ে ও দুই ছেলে
বিখ্যাত কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ
স্বাধীনতা তুমি, আসাদের শার্ট, বন্দী শিবির থেকে, রৌদ্র করোটিতে, উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ, স্মৃতির শহর
মৃত্যু
১৭ আগস্ট ২০০৬
সমাধি
বনানী কবরস্থান, ঢাকা
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি

শামসুর রাহমান ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার ৪৬ নম্বর মাহুতটুলীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুর থানার পাড়াতলী গ্রামে। তাঁর পিতার নাম মুখলেসুর রহমান চৌধুরী এবং মাতার নাম আমেনা বেগম। শামসুর রাহমানের ডাক নাম ছিল বাচ্চু। তেরো ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। পুরনো ঢাকার গলি-ঘুপচি, মাহুতটুলির জীবন্ত নাগরিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এই কারণেই তাঁকে বলা হয় 'নাগরিক কবি'।[ref]

শিক্ষাজীবন

শামসুর রাহমান ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু তিনি অনার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। তবে ১৯৫৩ সালে বিএ (পাস কোর্স) পাস করেন। ইংরেজি সাহিত্যে এমএ (প্রিলিমিনারি) পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও শেষ পর্বের পরীক্ষায় আর বসেননি তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তাঁর সঙ্গে জিল্লুর রহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, বদরুদ্দীন উমর, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।

কর্মজীবন ও সাংবাদিকতা

শামসুর রাহমান পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন দৈনিক মর্নিং নিউজ-এ। পরে তিনি দৈনিক পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ অবজার্ভার পত্রিকায় দীর্ঘকাল কাজ করেন। দৈনিক বাংলার সম্পাদক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। পেশাদার সাংবাদিকতার পাশাপাশি কবিতাচর্চা তাঁর জীবনের কেন্দ্রে সবসময় অটুট ছিল।[ref]

কবিতায় আগমন ও প্রাথমিক পরিচিতি

আঠারো বছর বয়সে শামসুর রাহমান প্রথম কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৯৪৩ সালে তাঁর প্রথম কবিতা 'উনিশশো উনপঞ্চাশ' প্রকাশিত হয় নলিনীকিশোর গুহ সম্পাদিত সোনার বাংলা পত্রিকায়। পরবর্তীতে কলকাতার বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত 'কবিতা' পত্রিকায় 'রূপালি স্নান' কবিতাটি প্রকাশিত হলে কবি হিসেবে শামসুর রাহমান সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে' বাংলা কবিতায় তাঁর অধিকার সুদৃঢ় করে।

কবিতায় সাহিত্যিক অবদান ও বৈশিষ্ট্য

শামসুর রাহমান বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগে দুই বাংলায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ শতকের তিরিশের দশকের পাঁচ মহান কবির পর তিনিই আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষ হিসেবে প্রসিদ্ধ।

পুরনো ঢাকায় বেড়ে ওঠায় নগর জীবনের নানা অনুষঙ্গ ও প্রকরণ উদ্ভাসিত হয়েছে এই নাগরিক কবির কবিতায়। জীবনানন্দ-পরবর্তী বাংলা কবিতাকে আধুনিকতার পথে ধাবিত করায় তাঁর ভূমিকা একেবারেই স্বতন্ত্র।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি কবিজীবনে শামসুর রাহমান কবিতার বিষয় ও ভাষায় নিরন্তর পরীক্ষাপ্রবণ ছিলেন। ১৯৭১-এর পূর্বে রচিত পাঁচটি কাব্যে তিনি কবি হিসেবে শীর্ষস্থান অর্জন করেন।[ref]

রাজনৈতিক সাহস ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর

শামসুর রাহমান স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে বিদ্রুপ করে ১৯৫৮ সালে সমকাল পত্রিকায় 'হাতির শুঁড়' নামক কবিতা লেখেন। শেখ মুজিবুর রহমান যখন কারাগারে ছিলেন, তখন তাঁকে উদ্দেশ্য করে লেখেন অসাধারণ কবিতা 'টেলেমেকাস'।

১৯৬৭ সালের ২২ জুন পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করলে শামসুর রাহমান সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকায় কর্মরত থাকা অবস্থায় পেশাগত অনিশ্চয়তার তোয়াক্কা না করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের পক্ষে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কবি

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের উপর লিখিত তাঁর দুটি কবিতা অত্যন্ত জনপ্রিয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি 'মজলুম আদিব' (বিপন্ন লেখক) ছদ্মনামে কলকাতার বিখ্যাত দেশ ও অন্যান্য পত্রিকায় কবিতা লিখতেন। 'বন্দী শিবির থেকে' (১৯৭২) কাব্যে স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন আবেগ ও প্রত্যাশা প্রাধান্য পেয়েছে এবং এর মাধ্যমে তিনি ব্যাপক কবিখ্যাতি অর্জন করেন। 'স্বাধীনতা তুমি' এবং 'তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা' — এই দুটি কবিতা বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে।

উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ

তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০), রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩), বিধ্বস্ত নীলিমা, নিরালোকে দিব্যরথ, বন্দী শিবির থেকে (১৯৭২) এবং উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ (১৯৮২)। এছাড়াও তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়া এবং গদ্য রচনাতেও উজ্জ্বল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ 'স্মৃতির শহর' পুরনো ঢাকার জীবনের এক অপূর্ব দলিল।

ব্যক্তিজীবন

১৯৫৫ সালের ৮ জুলাই শামসুর রাহমান জোহরা বেগমকে বিয়ে করেন। তাঁদের তিন মেয়ে ও দুই ছেলে।

পুরস্কার ও সম্মাননা

তাঁর অসামান্য সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮১), হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০) এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩ ও ১৯৯৪) লাভ করেন। এছাড়াও তিনি সার্ক সাহিত্য পুরস্কার এবং স্বাধীনতা পুরস্কারেও ভূষিত হন।[ref]

মৃত্যু

২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ঢাকার বনানী কবরস্থানে নিজ মায়ের কবরের পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।[ref]

জীবনীটি শেয়ার করুন

এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পটি অন্যদের সাথে ছড়িয়ে দিন।

Facebook WhatsApp