Bio.bd Logo
জসীমউদ্দীন
history_edu কবি

জসীমউদ্দীন

"জসীমউদ্‌দীন ছিলেন বাংলা সাহিত্যাঙ্গনের এক অনন্য কবি, যিনি গ্রামীণ জীবন, লোকসংস্কৃতি ও বাংলার পল্লীর আবেগকে সাহিত্যে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া এই খ্যাতিমান সাহিত্যিক কবি, গীতিকার, সুরকার ও লেখক হিসেবে সমানভাবে পরিচিত ছিলেন। গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র তাঁর লেখায় এত গভীরভাবে ফুটে ওঠে যে তিনি “পল্লী কবি” নামে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। বিংশ শতাব্দীতে বাংলা পল্লীসাহিত্যকে নতুন প্রাণ ও মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।"

edit_calendar 09 May, 2026 update আপডেট: 22 Jun, 2026 visibility 40

একনজরে

জন্ম
১ জানুয়ারি ১৯০৩
জন্মস্থান
তাম্বুলখানা গ্রাম, কৈজুরি ইউনিয়ন, ফরিদপুর, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
মৃত্যু
১৩ মার্চ ১৯৭৬, ঢাকা
সমাধিস্থল
গোবিন্দপুর গ্রাম, ফরিদপুর (পৈতৃক বাড়ির পাশে)
পিতা / মাতা
আনসারউদ্দিন মোল্লা / আমিনা খাতুন
স্ত্রী
মমতাজ বেগম
সন্তান
তিন পুত্র (জামাল আনওয়ার, ফিরোজ আনওয়ার, খুরশিদ আনওয়ার), দুই কন্যা (হাসনা মওদুদ, আসমা এলাহী)
শিক্ষা
প্রাথমিক: ফরিদপুর ওয়েলফেয়ার স্কুল / মাধ্যমিক: ফরিদপুর জিলা স্কুল (Entrance ১৯২১) / উচ্চমাধ্যমিক: রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর (IA ১৯২৪) / স্নাতক: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (BA ১৯২৯) / স্নাতকোত্তর: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (MA বাংলা ১৯৩১)
পুরস্কার
একুশে পদক ১৯৭৬ / স্বাধীনতা পুরস্কার ১৯৭৮ (মরণোত্তর) / D.Litt — রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত ১৯৬৯ / President's Award for Pride of Performance, পাকিস্তান ১৯৫৮
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

জসীমউদ্দীন ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর শহরের উপকণ্ঠে কৈজুরি ইউনিয়নের তাম্বুলখানা গ্রামে মাতামহের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আনসারউদ্দিন মোল্লা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক এবং মাতা আমিনা খাতুন  যিনি "রঙাছুট" নামেও পরিচিত ছিলেন। যদিও তাঁর পূর্ণ নাম জসীম উদ্দীন মোল্লা, তিনি জসীমউদ্দীন নামেই সকলের কাছে পরিচিত।[ref]

শিক্ষাজীবন

জসীমউদ্দীন ফরিদপুর ওয়েলফেয়ার স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯২১ সালে ফরিদপুর জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯২৪ সালে রাজেন্দ্র কলেজ থেকে IA পাস করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯২৯ সালে BA এবং ১৯৩১ সালে বাংলা ভাষায় MA ডিগ্রি অর্জন করেন।

"কবর" কবিতা — ছাত্রাবস্থায় পাঠ্যবইয়ে স্থান

জসীমউদ্দীন ছাত্রজীবনেই লেখা শুরু করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তিনি বিখ্যাত কবিতা "কবর" রচনা করেন। অসাধারণ এই কবিতাটি তাঁর ছাত্রাবস্থায়ই বাংলার পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়  বাংলা সাহিত্যে এমন দৃষ্টান্ত বিরল। একজন দাদা ও তাঁর নাতির কথোপকথনের আদলে বাঁধা এই কবিতায় মৃত্যু, বিচ্ছেদ ও গ্রামীণ জীবনের নশ্বরতা অপূর্বভাবে ফুটে উঠেছে।[ref]

গবেষণাজীবন — লোকসাহিত্যের খনিতে

১৯৩১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত লোক-সাহিত্য গবেষক ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের তত্ত্বাবধানে রামতনু লাহিড়ী গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন জসীমউদ্দীন। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত এই কাজে থেকে তিনি বিশাল পরিমাণ বাংলার লোকসাহিত্য ও লোকগীত সংগ্রহ করেন। তাঁর সংগৃহীত লোকগীতের সংখ্যা ছিল ১০,০০০-এরও বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি চাকরি

১৯৩৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত সেখানে অধ্যাপনা করেন। ১৯৪৪ সালে তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগে যোগ দেন এবং ১৯৬২ সালে উপপরিচালক পদে অবসর নেন। রেডিওকে তিনি গ্রামীণ সংস্কৃতি ও লোকসংগীত প্রচারের এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

নকশীকাঁথার মাঠ — বাংলা সাহিত্যের মহাকাব্য (১৯২৯)

জসীমউদ্দীনের দুটি অমর কীর্তি "নকশীকাঁথার মাঠ" (The Field of the Embroidered Quilt) এবং "সোজন বাদিয়ার ঘাট" বাংলা ভাষার সেরা গীতিকবিতার মধ্যে গণ্য হয় এবং বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। "নকশীকাঁথার মাঠ" হলো এক তরুণ গ্রামীণ দম্পতির বিয়োগান্ত প্রেমের আখ্যান। এই কবিতায় জসীমউদ্দীন সমৃদ্ধ দৃশ্যকল্প এবং স্থানীয় উপভাষার মাধ্যমে পাঠকদের হৃদয়ে গ্রামীণ বাংলার মানুষের আবেগ ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের এক অসাধারণ ছবি এঁকে দেন।[ref]

আব্বাসউদ্দীনের সাথে সৃজনী জুটি — বাংলা লোকসংগীতের স্বর্ণযুগ

১৯৩১ সালে কলকাতায় এক সাংগীতিক অনুষ্ঠানে কবি গোলাম মোস্তফার মাধ্যমে জসীমউদ্দীনের সাথে কিংবদন্তি লোকসংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীনের পরিচয় হয়। এই দুই মহান শিল্পীর সৃজনশীল মিলনে জন্ম নেয় বাংলা লোকসংগীতের অমূল্য সব রত্ন — "আমার সোনার ময়না পাখি", "প্রাণো সখিরে", "আমায় এতো রাতে", "নিশিতে যাইও ফুলবনে", "আমার হার কালা করলাম রে", "আমায় ভাসাইলি রে" প্রভৃতি।

রবীন্দ্রসংগীত রক্ষায় সাহসী প্রতিবাদ

জসীমউদ্দীন ছিলেন প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি সমাজতন্ত্র ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবল সমর্থক ছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রসংগীত সম্প্রচার বন্ধ করার উদ্যোগ নিলে জসীমউদ্দীন সাহসিকতার সাথে এর প্রতিবাদ করেন।[ref]

বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান

১৯৭৪ সালে তাঁকে বাংলা একাডেমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়, কিন্তু তিনি সেই পুরস্কার গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। প্রতিষ্ঠান ও পুরস্কারের বিরুদ্ধে এই সাহসী প্রত্যাখ্যান তাঁর আপোষহীন চরিত্রের প্রমাণ।

রচনাবলি — এক বিশাল সাহিত্য-ভুবন

জসীমউদ্দীন ২১টি কবিতাগ্রন্থ, ৭টি নাটক, ১টি উপন্যাস, ৫টি স্মৃতিকথা এবং ৪টি ভ্রমণকাহিনি রচনা করেছেন। উল্লেখযোগ্য কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ: রাখালী (১৯২৭), নকশীকাঁথার মাঠ (১৯২৯), বালুচর (১৯৩০), সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৩), রঙিলা নায়ের মাঝি (১৯৩৫), মাটির কান্না (১৯৫১), সুচয়নী (১৯৬১), পদ্মানদীর দেশে (১৯৬৯)। তাঁর নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে পদ্মাপার, বেদের মেয়ে, মধুমালা, পল্লীবধূ, গ্রামের মায়া, ওগো পুষ্পধনু, আসমান সিংহ।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ ঢাকায় জসীমউদ্দীন মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ফরিদপুরের গোবিন্দপুরে পৈতৃক বাড়ির পাশে সমাহিত করা হয়।

তাঁর কন্যা হাসনা মওদুদ রাজনীতিবিদ মওদুদ আহমদের স্ত্রী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আধিপত্যের যুগে নিজস্ব স্বতন্ত্র কাব্যভাষা তৈরি করে জসীমউদ্দীন বাংলা সাহিত্যে চিরন্তন আসন পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের অতুলনীয় প্রতিভার যুগে যখন অধিকাংশ কবি তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছিলেন, তখন জসীমউদ্দীন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কাব্যপথে হেঁটে নিজের অনন্য পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন  গ্রামীণ পরিবেশ, মানুষ, সম্পর্ক ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্রে রেখে।[ref]

জীবনীটি শেয়ার করুন

এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পটি অন্যদের সাথে ছড়িয়ে দিন।

Facebook WhatsApp