Bio.bd Logo
শহীদুল্লাহ কায়সার
newspaper সাংবাদিক

শহীদুল্লাহ কায়সার

"শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী ও শহীদ বুদ্ধিজীবী। বাংলা সাহিত্যে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস সংশপ্তক ও সারেং বৌ-এর জন্য। তাঁর সাহিত্যকর্মে সমাজবাস্তবতা, কৃষক-শ্রমিকের জীবন, রাজনৈতিক সংগ্রাম, দারিদ্র্য, শোষণ এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে উঠে এসেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানি বাহিনী ও আল-বদর বাহিনীর হাতে অপহৃত হয়ে তিনি শহীদ হন। এজন্য তিনি বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম প্রতীক।"

edit_calendar 13 May, 2026 update আপডেট: 22 Jun, 2026 visibility 29

একনজরে

জন্ম
আবু নঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লা ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৭
অন্তর্ধান
১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ (৪৪ বছর) ঢাকা
অবস্থা
মৃত মনে করা হয়
শিক্ষা
বিএ (অর্থনীতি)
পেশা
লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক
দাম্পত্য সঙ্গী
পান্না কায়সার
সন্তান
শমী কায়সার ও অমিতাভ কায়সার
আত্মীয়
জহির রায়হান (ভাই)
পুরস্কার
বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৯) একুশে পদক (১৯৮৩) স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৮)
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more

পরিচয়

শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী ও শহীদ বুদ্ধিজীবী। বাংলা সাহিত্যে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস সংশপ্তক ও সারেং বৌ-এর জন্য।

তাঁর সাহিত্যকর্মে সমাজবাস্তবতা, কৃষক-শ্রমিকের জীবন, রাজনৈতিক সংগ্রাম, দারিদ্র্য, শোষণ এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে উঠে এসেছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানি বাহিনী ও আল-বদর বাহিনীর হাতে অপহৃত হয়ে তিনি শহীদ হন। এজন্য তিনি বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম প্রতীক।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

শহীদুল্লাহ কায়সারের জন্ম ১৯২৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল আবু নঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

তাঁর পিতা মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ছিলেন শিক্ষাবিদ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। মাতা সৈয়দা সুফিয়া খাতুন ছিলেন শিক্ষিত ও সমাজসচেতন নারী।

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ছিলেন তাঁর ছোট ভাই। স্ত্রী পান্না কায়সার পরবর্তীতে লেখক ও সমাজকর্মী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।[ref] .

শিক্ষাজীবন

তিনি গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে কলকাতায় গিয়ে সরকারি মডেল স্কুল ও আলিয়া মাদ্রাসার অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগে পড়াশোনা করেন।

১৯৪২ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৬ সালে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন।

পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ এবং আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও দেশভাগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পড়াশোনা সম্পূর্ণ করতে পারেননি। 

রাজনৈতিক জীবন

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য ছিলেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার কারণে জীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে।

আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময়ও তিনি বন্দি ছিলেন। দীর্ঘ কারাজীবন তাঁর রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক চিন্তাকে আরও গভীর করে তোলে। 

সাংবাদিকতা জীবন

তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দেন ১৯৪৯ সালে। প্রথমে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক-এ কাজ করেন। পরে দৈনিক সংবাদ-এর সম্পাদকীয় বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী লেখা অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। তিনি “দেশপ্রেমিক” ও “বিশ্বকর্মা” ছদ্মনামেও লিখতেন।

সাংবাদিক হিসেবে তিনি নিপীড়িত মানুষের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতেন। 

সাহিত্যজীবন

শহীদুল্লাহ কায়সারের সাহিত্যকর্ম সমাজসচেতন ও বাস্তবধর্মী। তাঁর উপন্যাসে মধ্যবিত্ত সমাজ, রাজনৈতিক সংঘাত, গ্রামীণ জীবন ও শোষিত মানুষের সংগ্রাম জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

তাঁর ভাষা ছিল সহজ, প্রাণবন্ত ও আবেগপূর্ণ। রাজনৈতিক আদর্শ ও মানবিক অনুভূতির সমন্বয় তাঁর সাহিত্যকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।

তিনি গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথা লিখেছেন। [ref].

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ

তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • সংশপ্তক
  • সারেং বৌ
  • কৃষ্ণচূড়া মেঘ
  • দিগন্তে ফুলের আগুন
  • চন্দ্রবিন্দু
  • রাজবন্দীর রোজনামচা

“সংশপ্তক”

শহীদুল্লাহ কায়সারের সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস হলো—

সংশপ্তক

এই উপন্যাসে গ্রামীণ সমাজ, রাজনৈতিক পরিবর্তন, মানুষের সংগ্রাম ও সামাজিক বাস্তবতা গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

পরবর্তীতে এটি টেলিভিশন নাটক হিসেবে নির্মিত হলে বাংলাদেশের মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আজও সংশপ্তক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত।

“সারেং বৌ”

তাঁর আরেকটি বিখ্যাত উপন্যাস সারেং বৌ। এতে নদীকেন্দ্রিক বাংলার জীবন, নারীর সংগ্রাম ও সামাজিক বাস্তবতা অত্যন্ত আবেগপূর্ণভাবে ফুটে উঠেছে।

এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। 

মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ হওয়া

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর লেখায় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়।

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর, বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে, আল-বদর বাহিনী তাঁকে ঢাকার বাসা থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি।

ধারণা করা হয়, তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাঁর নাম বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকায় চিরস্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে আছে।[ref] .

ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাধারা

শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন প্রগতিশীল, মানবতাবাদী ও সংগ্রামী চিন্তার মানুষ। তিনি সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাস করতেন এবং সাধারণ মানুষের মুক্তিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন।

তাঁর সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানুষের প্রতি গভীর সহমর্মিতা দেখা যায়।

তিনি বিশ্বাস করতেন—

“সাহিত্য মানুষের চেতনা জাগ্রত করার শক্তিশালী মাধ্যম।”

পুরস্কার ও সম্মাননা

তাঁর সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি বহু সম্মাননা লাভ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৯)
  • একুশে পদক (মরণোত্তর, ১৯৮৩)
  • স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর, ১৯৯৮) [ref].

জীবনীটি শেয়ার করুন

এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পটি অন্যদের সাথে ছড়িয়ে দিন।

Facebook WhatsApp