Bio.bd Logo
আবদুল গাফফার চৌধুরী
newspaper সাংবাদিক

আবদুল গাফফার চৌধুরী

"আবদুল গাফফার চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও গীতিকার। বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর নাম অমর হয়ে আছে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” গানের রচয়িতা হিসেবে। তিনি শুধু একজন গীতিকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রগতিশীল চিন্তাবিদ এবং সাহসী সাংবাদিক। তাঁর লেখায় বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন গভীরভাবে উঠে এসেছে।"

edit_calendar 13 May, 2026 update আপডেট: 22 Jun, 2026 visibility 21

একনজরে

জন্ম
১২ ডিসেম্বর ১৯৩৪
মৃত্যু
১৯ মে ২০২২ (বয়স ৮৭)
পেশা
সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলাম লেখক
জাতীয়তা
বাংলাদেশী
উল্লেখযোগ্য রচনা
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানের গীতিকার
সন্তান
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more

পরিচয়

আবদুল গাফফার চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও গীতিকার। বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর নাম অমর হয়ে আছে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” গানের রচয়িতা হিসেবে।

তিনি শুধু একজন গীতিকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রগতিশীল চিন্তাবিদ এবং সাহসী সাংবাদিক। তাঁর লেখায় বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন গভীরভাবে উঠে এসেছে।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

আবদুল গাফফার চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া গ্রামে। তিনি একটি রাজনৈতিক ও শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পিতা হাজী ওয়াহেদ রেজা চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত বাংলার বরিশাল জেলা কংগ্রেস কমিটি ও খেলাফত কমিটির নেতা। ছোটবেলা থেকেই পরিবারে রাজনৈতিক সচেতনতা ও সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ ছিল। এই পরিবেশ তাঁর মানসিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। [ref].

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

শৈশব থেকেই তিনি সাহিত্যচর্চার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। মাত্র স্কুলজীবনেই তাঁর কবিতা ও লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হতে শুরু করে।

তিনি বরিশালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকায় এসে ঢাকা কলেজ-এ পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ অধ্যয়ন করেন।

ছাত্রজীবনেই তিনি সাংবাদিকতা ও সাহিত্যজগতে পরিচিতি লাভ করেন। [ref].

সাংবাদিকতা জীবনের শুরু

১৯৫০ সালে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় প্রবেশ করেন। তাঁর প্রথম কর্মস্থল ছিল দৈনিক ইনসাফ। পরে তিনি ধারাবাহিকভাবে কাজ করেন—

  • দৈনিক সংবাদ
  • সওগাত
  • দৈনিক ইত্তেফাক
  • দৈনিক আজাদ
  • দৈনিক পূর্বদেশ
  • দৈনিক আওয়াজ

সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায়।

তিনি শুধু সংবাদসম্পাদক বা কলামিস্টই ছিলেন না; বিভিন্ন সাহিত্য ও রাজনৈতিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর লেখনী ছিল তীক্ষ্ণ, স্পষ্ট ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন। [ref].

ভাষা আন্দোলন ও অমর গান

আবদুল গাফফার চৌধুরীর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তিনি ভাষা আন্দোলনের অমর গান—

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”

—এর রচয়িতা।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে তিনি এই গানটি রচনা করেন। পরে সুরকার আলতাফ মাহমুদ গানটিতে সুরারোপ করেন।

এই গান শুধু বাংলাদেশের নয়; বাংলা ভাষাভাষী মানুষের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও ভাষাপ্রেমের প্রতীক হয়ে ওঠে। আজও একুশে ফেব্রুয়ারিতে গানটি গভীর আবেগের সঙ্গে গাওয়া হয়।[ref] .

সাহিত্যচর্চা

আবদুল গাফফার চৌধুরী ছিলেন বহুমাত্রিক সাহিত্যিক। তিনি গল্প, উপন্যাস, নাটক, স্মৃতিকথা, রাজনৈতিক প্রবন্ধ ও কলাম লিখেছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • কৃষ্ণপক্ষ
  • সম্রাটের ছবি
  • সুন্দর হে সুন্দর
  • চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান
  • নিরুদ্দিষ্ট নয় মাস
  • আমরা বাংলাদেশী না বাঙালি
  • পলাশি থেকে ধানমণ্ডি
  • ইতিহাসের রক্তপলাশ পঁচাত্তর

তাঁর লেখায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি পরিচয়ের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভূমিকা

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পরিবারসহ ভারতে চলে যান। কলকাতায় অবস্থান করে তিনি মুজিবনগর সরকারের পক্ষে কাজ করেন।

তিনি স্বাধীন বাংলার প্রথম নিবন্ধিত পত্রিকা সাপ্তাহিক জয়বাংলা-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক ছিলেন। একই সময়ে তিনি ভারতের আনন্দবাজার ও যুগান্তর পত্রিকায়ও লেখালেখি করেন।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে তাঁর লেখাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। [ref].

প্রবাসজীবন

১৯৭৪ সালে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনে যান। পরে সেখানেই দীর্ঘদিন বসবাস করেন।

প্রবাসে থেকেও তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে নিয়মিত কলাম লিখেছেন। তাঁর রাজনৈতিক কলামগুলো দেশে-বিদেশে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।

তিনি লন্ডন থেকে বিভিন্ন বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকাও সম্পাদনা করেন।[ref] .

রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তা

আবদুল গাফফার চৌধুরী ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দৃঢ় সমর্থক।

তাঁর লেখায়—

  • অসাম্প্রদায়িকতা
  • ভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব
  • মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ
  • গণতন্ত্র
  • সামাজিক ন্যায়বিচার

এসব বিষয় গভীরভাবে উঠে এসেছে।

তিনি সামরিক শাসন, সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারের সমালোচক ছিলেন। তাঁর কলামগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্ক ও জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।

পুরস্কার ও সম্মাননা

সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও জাতীয় জীবনে অবদানের জন্য তিনি বহু সম্মাননা লাভ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৭)
  • একুশে পদক (১৯৮৩)
  • স্বাধীনতা পুরস্কার (২০০৯)
  • ইউনেস্কো পুরস্কার

ব্যক্তিত্ব

আবদুল গাফফার চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টভাষী, সাহসী ও মানবিক মানুষ। তিনি আপসহীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতেন।

তাঁর লেখায় আবেগ ও রাজনৈতিক সচেতনতার এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়। বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ এখনও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

মৃত্যু

আবদুল গাফফার চৌধুরী ২০২২ সালের ১৯ মে লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। পরে তাঁকে ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে।

জীবনীটি শেয়ার করুন

এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পটি অন্যদের সাথে ছড়িয়ে দিন।

Facebook WhatsApp