মুহাম্মদ ইউনূস
"মুহাম্মদ ইউনুস একজন বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ, সামাজিক উদ্যোক্তা, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী। ক্ষুদ্রঋণ বা মাইক্রোক্রেডিট ধারণাকে তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে তোলেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল জামানত ছাড়া দরিদ্র মানুষ বিশেষ করে নারীদের আয়মুখী কাজে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা। ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পদ ছাড়েন।"
একনজরে
- জন্ম
- ২৮ জুন ১৯৪০
- জন্মস্থান
- চট্টগ্রাম অঞ্চল, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত; বর্তমান বাংলাদেশ
- পেশা
- অর্থনীতিবিদ, সামাজিক উদ্যোক্তা, শিক্ষাবিদ
- পরিচিতি
- গ্রামীণ ব্যাংক, মাইক্রোক্রেডিট, সামাজিক ব্যবসা
- উল্লেখযোগ্য পুরস্কার
- নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০০৬, Presidential Medal of Freedom, Congressional Gold Medal
- রাষ্ট্রীয় ভূমিকা
- বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, ২০২৪–২০২৬
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
নয় ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় সন্তান হিসেবে ১৯৪০ সালের ২৮ জুন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বাথুয়া গ্রামে মুহাম্মদ ইউনূসের জন্ম। বাবা হাজী মুহাম্মদ দুলা মিয়া সওদাগর ছিলেন একজন সুফি স্বর্ণকার, আর মা সুফিয়া খাতুন ছিলেন পরিবারের মূল স্তম্ভ।
১৯৪৪ সালে পরিবার চট্টগ্রাম শহরে স্থানান্তরিত হয়। ইউনূস চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং পরে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ছাত্রজীবনে বয়স্কাউটিংয়ে সক্রিয় থেকে পশ্চিম পাকিস্তান, ভারত, ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের সুযোগ পান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর ফুলব্রাইট বৃত্তিতে Vanderbilt University থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করেন। পড়ার পাশাপাশি Middle Tennessee State University-তে শিক্ষকতাও করেছেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অবস্থায় তিনি Nashville-এ নাগরিক কমিটি গঠন করেন এবং Bangladesh Newsletter প্রকাশের মাধ্যমে স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগ দেন। [ref]
গ্রামীণ ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণের বিপ্লব
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর ইউনূস শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে তৃপ্ত থাকতে পারলেন না। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেবেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের জোবরা গ্রামে গিয়ে দেখলেন, খুব সামান্য মূলধনের অভাবে দরিদ্র মানুষেরা মহাজনদের ফাঁদে আটকা পড়ে আছেন। ১৯৭৬ সালে তিনি নিজের পকেট থেকে অর্থ ধার দিয়ে এই সংকট মেটানোর প্রথম পদক্ষেপ নেন।
১৯৭৬ সালে শুরু হওয়া ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিতে ঋণগ্রহীতারা দলবদ্ধ হন, যেখানে পারস্পরিক দায়বদ্ধতাই জামানাতের কাজ করে। ১৯৮৩ সালে সরকার গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্পকে স্বাধীন ব্যাংকের মর্যাদা দেয়।
ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঋণ বিতরণ করেছে এবং পরিশোধের হার ৯৮ শতাংশের কাছাকাছি। ব্যাংকের মালিকানার ৯৫ ভাগ সদস্যদের হাতে, মাত্র ৫ ভাগ সরকারের। গ্রামীণের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বিশ্বের একশোটিরও বেশি দেশে একই ধরনের ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে — এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও।[ref]
নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০০৬
২০০৬ সালে মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন "নিচ থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সাধনের প্রচেষ্টার" স্বীকৃতিস্বরূপ। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি তাঁর দূরদর্শী ধারণাকে কার্যকর বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষমতার প্রশংসা করে। ইউনূস প্রমাণ করেছেন যে জামানাতবিহীন ঋণ দেওয়া — যা একসময় অকল্পনীয় মনে হতো — আসলে সম্ভব এবং কার্যকর। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নোবেল পুরস্কারজয়ী।[ref]
সামাজিক ব্যবসা দর্শন ও গ্রামীণ পরিবার
ইউনূস ক্ষুদ্রঋণের বাইরেও "সামাজিক ব্যবসা" নামে এক নতুন মডেল প্রবর্তন করেন, যেখানে মুনাফার পরিবর্তে সমাজের সমস্যা সমাধানই মূল উদ্দেশ্য। তাঁর "তিন শূন্যের বিশ্ব" দর্শনে শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণের স্বপ্ন দেখা হয়।
গ্রামীণ ব্যাংকের পাশাপাশি তিনি গ্রামীণফোন, গ্রামীণ শক্তি, গ্রামীণ ফান্ড, গ্রামীণ টেক্সটাইল, গ্রামীণ নিটওয়্যার, গ্রামীণ ডানোনে ফুডস এবং গ্রামীণ হেলথকেয়ারসহ অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১২ সালে তিনি স্কটল্যান্ডের Glasgow Caledonian University-র চ্যান্সেলর হন এবং ২০১৮ পর্যন্ত ওই দায়িত্ব পালন করেন।[ref]
রাজনৈতিক জীবন ও বিতর্ক
২০০৭ সালে ইউনূস "নাগরিক শক্তি" নামে রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী লড়াইয়ে আর নামেননি। ২০১০ সালে একটি নরওয়েজিয়ান তথ্যচিত্রে গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলেও নরওয়েজিয়ান কর্তৃপক্ষ পরে তাঁদের দোষমুক্ত ঘোষণা করে। ২০১১ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেয়। ইউনূস দাবি করেন এই অপসারণ ছিল রাজনৈতিক।[ref]
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে (২০২৪–২০২৬)
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ছাড়ার পর Students Against Discrimination-এর উদ্যোগে ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মনোনীত করা হয়।
তখন ইউনূস প্যারিসে অবস্থান করছিলেন। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্ব হিসেবে সামরিক কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজ উভয়ই তাঁকে সমর্থন দেয়। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান।
তাঁর সরকার জুলাই সনদ প্রণয়ন করে, যা ৩০টি রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সাংবিধানিক, প্রশাসনিক ও নির্বাচনী সংস্কারের রূপরেখা।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং BNP ভূমিধস বিজয় পায়। ১৬ ফেব্রুয়ারি বিদায়ী ভাষণে ইউনূস বলেন, "আজ অন্তর্বর্তী সরকার পদত্যাগ করছে। কিন্তু গণতন্ত্রের চর্চা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের যে যাত্রা শুরু হয়েছে, তা যেন না থামে।"
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি সরকারি বাসভবন ছেড়ে দেন।[ref]
পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
বিরল কয়েকজনের মধ্যে ইউনূস একজন যিনি একসঙ্গে নোবেল শান্তি পুরস্কার, মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্বাধীনতা পদক (২০০৯) এবং কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল (২০১০) — তিনটিই অর্জন করেছেন। এছাড়া ২০২৫ সালে Time Magazine-এর ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের তালিকায় স্থান পান এবং বিশ্বের ৫০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট পেয়েছেন।[ref]
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি
মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর দর্শন বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন কয়েকটি প্রভাবশালী বইয়ে:
- Banker to the Poor — গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আত্মজৈবনিক রচনা
- Creating a World Without Poverty (২০০৮) — সামাজিক ব্যবসার ধারণা উপস্থাপন
- Building Social Business (২০১০) — মানবতার সেবায় নিবেদিত পুঁজিবাদের বিবরণ
- A World of Three Zeroes — শূন্য দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বন নিঃসরণের রূপরেখা[ref]