Bio.bd Logo
ফজলে হাসান আবেদ
volunteer_activism সমাজসেবক

ফজলে হাসান আবেদ

"ফজলে হাসান আবেদ ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজসংস্কারক, মানবতাবাদী ও উন্নয়নচিন্তাবিদ। তিনি বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা BRAC-এর প্রতিষ্ঠাতা। দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, নারীশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ক্ষমতায়নে তাঁর অবদান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তিনি শুধু একজন সমাজকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন উন্নয়নের নতুন ধারণার নির্মাতা। তাঁর কাজ প্রমাণ করেছে যে সঠিক পরিকল্পনা, শিক্ষা ও মানবিক নেতৃত্বের মাধ্যমে কোটি মানুষের জীবন পরিবর্তন করা সম্ভব।"

edit_calendar 13 May, 2026 update আপডেট: 22 Jun, 2026 visibility 23

একনজরে

জন্ম
২৭ এপ্রিল ১৯৩৬
মৃত্যু
২০ ডিসেম্বর ২০১৯ (বয়স ৮৩)
জাতীয়তা
বাংলাদেশি
শিক্ষা
নৌ স্থাপত্য
পেশা
চেয়ার এমেরিটাস, ব্র্যাক
পরিচিতির কারণ
ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান
সন্তান
তমারা হাসান আবেদ (মেয়ে) শামেরান আবেদ (ছেলে)
পুরস্কার
স্বাধীনতা পুরস্কার (২০২৫)
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more

পরিচয়

ফজলে হাসান আবেদ ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজসংস্কারক, মানবতাবাদী ও উন্নয়নচিন্তাবিদ। তিনি বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা BRAC-এর প্রতিষ্ঠাতা। দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, নারীশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ক্ষমতায়নে তাঁর অবদান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

তিনি শুধু একজন সমাজকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন উন্নয়নের নতুন ধারণার নির্মাতা। তাঁর কাজ প্রমাণ করেছে যে সঠিক পরিকল্পনা, শিক্ষা ও মানবিক নেতৃত্বের মাধ্যমে কোটি মানুষের জীবন পরিবর্তন করা সম্ভব।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

ফজলে হাসান আবেদ ১৯৩৬ সালের ২৭ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচংয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী। পিতা ছিলেন জমিদার পরিবারের সদস্য। মায়ের নাম সৈয়দা সুফিয়া খাতুন।

শৈশবের একটি অংশ তিনি হবিগঞ্জ, কুমিল্লা ও পাবনায় কাটান। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ও দায়িত্বশীল ছিলেন। সমাজের বৈষম্য ও দারিদ্র্য তাঁকে গভীরভাবে ভাবাত। [ref].

শিক্ষাজীবন

তিনি পাবনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন এবং পরে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি স্কটল্যান্ডের University of Glasgow-এ নেভাল আর্কিটেকচার বিষয়ে ভর্তি হন। পরে তিনি সেই বিষয় ছেড়ে লন্ডনে Chartered Institute of Management Accountants-এ পড়াশোনা করেন এবং ব্যবস্থাপনা হিসাববিদ্যায় পেশাগত ডিগ্রি অর্জন করেন। [ref].

কর্মজীবনের শুরু

দেশে ফিরে তিনি আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি Shell Oil-এ যোগ দেন। খুব অল্প সময়ে তিনি উচ্চপদে উন্নীত হন এবং কোম্পানির ফাইন্যান্স বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেন।

করপোরেট জীবনে সফল হলেও তিনি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যে সন্তুষ্ট ছিলেন না। মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা তাঁর মধ্যে সবসময় কাজ করত।[ref] .

১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় ও মানবিক কাজ

১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় অঞ্চলে বিপুল মানুষ মারা যায়। এই দুর্যোগ তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

তিনি বন্ধুদের নিয়ে “HELP” নামে একটি ত্রাণসংগঠন গড়ে তোলেন এবং মনপুরাসহ দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ শুরু করেন। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তাঁর বৃহত্তর মানবিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি তৈরি করে। [ref].

মুক্তিযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রচারণা

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পাকিস্তানি করপোরেট চাকরি ছেড়ে লন্ডনে চলে যান। সেখানে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন, তহবিল সংগ্রহ ও প্রচারণায় যুক্ত হন।

তিনি “Action Bangladesh” নামের সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ইউরোপে সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর এই ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।

BRAC প্রতিষ্ঠা

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ফিরে তিনি নিজের লন্ডনের ফ্ল্যাট বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করেন।

১৯৭২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন BRAC। শুরুতে এর পূর্ণরূপ ছিল Bangladesh Rural Advancement Committee। পরে এটি বিশ্বের বৃহত্তম উন্নয়ন সংস্থাগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

BRAC-এর কাজের প্রধান ক্ষেত্রগুলো ছিল—

  • শিক্ষা
  • স্বাস্থ্যসেবা
  • নারী উন্নয়ন
  • ক্ষুদ্রঋণ
  • কৃষি উন্নয়ন
  • দারিদ্র্য বিমোচন
  • সামাজিক ক্ষমতায়ন

আজ বিশ্বের বহু দেশে BRAC কাজ করছে এবং কোটি মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।

শিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়ন

ফজলে হাসান আবেদ বিশ্বাস করতেন—

“দারিদ্র্য দূর করার সবচেয়ে বড় উপায় হলো শিক্ষা।”

তিনি গ্রামীণ দরিদ্র শিশুদের জন্য BRAC স্কুল চালু করেন, যেখানে বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে নারীস্বনির্ভরতা ও ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক উন্নয়ন মডেল জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

ফজলে হাসান আবেদের কাজ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়। তিনি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • Ramon Magsaysay Award
  • Gates Foundation Global Health Award
  • Clinton Global Citizen Award
  • David Rockefeller Award

২০১০ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে “Knight Commander of the Order of St Michael and St George (KCMG)” উপাধিতে ভূষিত করে। এরপর থেকে তিনি “Sir Fazle Hasan Abed” নামে পরিচিত হন। [ref].

উন্নয়নচিন্তা ও দর্শন

ফজলে হাসান আবেদের উন্নয়নচিন্তার মূল ভিত্তি ছিল মানবিকতা। তিনি মনে করতেন উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; মানুষের মর্যাদা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বাধীনতার সঙ্গেও উন্নয়ন জড়িত।

তিনি দরিদ্র মানুষকে সাহায্যের পাত্র নয়, বরং সক্ষম মানুষ হিসেবে দেখতেন। তাঁর উন্নয়ন মডেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—

  • অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন
  • নারীর ক্ষমতায়ন
  • টেকসই সামাজিক পরিবর্তন
  • স্থানীয় নেতৃত্ব তৈরি

ব্যক্তিত্ব

ফজলে হাসান আবেদ ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, দূরদর্শী ও মানবিক মানুষ। বিশাল আন্তর্জাতিক সাফল্য অর্জন করলেও তিনি সাদামাটা জীবনযাপন পছন্দ করতেন।

তিনি তরুণদের সমাজের জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত করতেন এবং বিশ্বাস করতেন—

“মানুষের সম্ভাবনার ওপর আস্থা রাখতে হবে।”

মৃত্যু

স্যার ফজলে হাসান আবেদ ২০১৯ সালের ২০ ডিসেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের উন্নয়ন ও মানবিক কর্মকাণ্ডের জগতে গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে।

জীবনীটি শেয়ার করুন

এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পটি অন্যদের সাথে ছড়িয়ে দিন।

Facebook WhatsApp