জামাল ভূঁইয়া
"জামাল হ্যারিস ভূঁইয়া বাংলাদেশের ফুটবলের অন্যতম পরিচিত মুখ ও অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার। ১৯৯০ সালের ১০ এপ্রিল ডেনমার্কে জন্ম নেওয়া এই পেশাদার ফুটবলার বর্তমানে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের হয়ে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেন। বিদেশে বেড়ে উঠলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল-এর নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ও অভিজ্ঞতার কারণে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ফুটবলারদের একজন হিসেবে পরিচিত।"
একনজরে
- জন্ম
- ১০ এপ্রিল ১৯৯০
- জন্মস্থান
- গ্লস্ট্রুপ, কোপেনহেগেন, ডেনমার্ক
- ধর্ম
- ইসলাম
- স্ত্রী
- তাতিয়ানা
- উচ্চতা
- ১.৭৩ মি (৫ ফুট ৮ ইঞ্চি)
- পজিশন
- ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার
- জার্সি নং
- ৬
- জাতীয় অভিষেক
- ৩১ আগস্ট ২০১৩ বনাম নেপাল (SAFF)
- অর্জন ও পুরস্কার
- BPL শিরোপা ২০১৫ (শেখ জামাল) / ফেডারেশন কাপ ২০১৫ / King's Cup ২০১৪ (MVP) / Bangabandhu Cup MVP / এশিয়ান গেমস ২০১৮ নকআউট রাউন্ড (বাংলাদেশ ইতিহাস) / SAFF সেমিফাইনাল ২০২৩ /বাংলাদেশের সর্বাধিক ক্যাপধারী ফুটবলার
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
জামাল ভূঁইয়া ডেনমার্কের গ্লস্ট্রুপে জন্মগ্রহণ করেন এবং ব্রন্ডবি নর্ড উপশহরে বড় হন। তাঁর বাবা-মা ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশ থেকে ডেনমার্কে অভিবাসী হন। তাঁর ভাই তারিক ভূঁইয়া এবং আরেক ভাই — তিন ভাইকে নিয়ে ছোট্ট পরিবারে ডেনমার্কের কঠিন পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। জামাল ইংরেজি ও ডেনিশ ভাষায় সাবলীল এবং বাংলায় আংশিক দক্ষ।
শৈশব ও ফুটবলের সূচনা
জামাল ভূঁইয়া শৈশব থেকেই ফুটবলের প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি ডেনমার্কের অন্যতম বড় ক্লাব ব্রন্ডবি IF-এর যুব দলে খেলতে শুরু করেন। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী FC কোপেনহেগেনের বিপক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল করার পর FCK কোচ তাঁর কাছে এসে দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কোচ তাঁকে বলেছিলেন, "জামাল, তোমার টেকনিক ভালো, কিন্তু শারীরিক দিকে কাজ করতে হবে। তবে যদি বুদ্ধি ব্যবহার করো, ঠিকই এগিয়ে যাবে — কারণ ফুটবল শুধু শরীরের খেলা নয়।" [ref]
গুলিবিদ্ধ — জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা
১৬ বছর বয়সে, ২০০৬ সালের ১৭ নভেম্বর শুক্রবার বিকেলে, FC কোপেনহেগেনের সিনিয়র দলে প্রমোশনের দ্বারপ্রান্তে থাকা জামালের ক্যারিয়ার হঠাৎ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। কোপেনহেগেনের উপকণ্ঠে গ্যাং-সংঘর্ষের মাঝে পড়ে তিনি চারটি গুলিবিদ্ধ হন। একটি গুলি তাঁর হৃদয় মাত্র দুই সেন্টিমিটার দূর দিয়ে বেরিয়ে যায়। দুই দিন কোমায় থাকার পর নার্স তাঁকে ফোনের বদলে একটি পত্রিকা দেন — যাতে তাঁরই ছবি ছাপা।[ref]
হাসপাতালে পাঁচ মাস থেকে ১২টি অস্ত্রোপচার সহ্য করেছেন তিনি। ডাক্তাররা একসময় পরামর্শ দিয়েছিলেন পায়ের স্নায়ু কেটে হাতে লাগানোর, কিন্তু জামাল বলেছিলেন, "আমার পা দরকার।" বুলেটের কারণে তাঁর ডান হাতে আজও আংশিক পক্ষাঘাত রয়েছে। হাসপাতাল ছেড়ে দুই বছর হুইলচেয়ারে কাটান এবং মনে করেছিলেন সব শেষ হয়ে গেছে।[ref]
অদম্য প্রত্যাবর্তন
অসাধারণ মনোবল ও ফুটবলের প্রতি তীব্র ভালোবাসা নিয়ে জামাল ২০০৯ সালে ডেনমার্কের নিচের বিভাগে আবার ফুটবলে ফেরেন। Hellerup IK-এ তিন বছরের চুক্তিতে যোগ দিলেও খুব কম খেলার সুযোগ পান।[ref]
বাংলাদেশে আগমন ও জাতীয় দলে ডাক
২০০৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন তাঁকে জাতীয় দলে খেলার আমন্ত্রণ জানায়। তবে পারিবারিক জটিলতায় সেবার যোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ২০০৮ সালে দেশে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরিবার থেকে দূরে থাকা এবং খাবার ও পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে ডেনমার্কে ফিরে আসেন। ২০১২ সালে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম বড় ক্লাব আবাহনী লিমিটেড ঢাকায় যোগ দেন।[ref]
জাতীয় দলে অভিষেক — ইতিহাস রচনা
২০১৩ সালের ৩১ আগস্ট SAFF চ্যাম্পিয়নশিপে নেপালের বিপক্ষে জামাল ভূঁইয়া বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলে অভিষেক করেন এবং প্রথম অনাবাসী খেলোয়াড় হিসেবে জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস গড়েন। বঙ্গবন্ধু কাপে আট দেশের অংশগ্রহণে তিনি সেরা খেলোয়াড়ের (MVP) পুরস্কার পান।
ক্লাব ক্যারিয়ার — ঘরে ও বিদেশে
২০১৪ সালে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবে যোগ দিয়ে অভিষেক মৌসুমেই ২০১৫ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ও ২০১৫ ফেডারেশন কাপ — দুটি শিরোপা জিতে ডমেস্টিক ডাবল অর্জন করেন। ভুটানে অনুষ্ঠিত ২০১৪ কিংস কাপেও তিনি সাংবাদিকদের ভোটে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। ২০২০ সালে তিনি ভারতের I-League ক্লাব কলকাতা মোহামেডানে ধারে যোগ দেন। চার্চিল ব্রাদার্সের বিপক্ষে ম্যাচে অধিনায়ক হিসেবে খেলে তিনি ১৯৯০-এর দশকে মনেম মুন্নার পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে কোনো ভারতীয় ফুটবল ক্লাবের অধিনায়কত্ব করেন। ২০২৩ সালের আগস্টে আর্জেন্টিনার Torneo Federal A ক্লাব Club Sol de Mayo-তে যোগ দেন — এটি ছিল বাংলাদেশি ফুটবলের ইতিহাসে দক্ষিণ আমেরিকার লিগে খেলার বিরল ঘটনা। বুয়েনোস আইরেসে নামার সময় প্রায় ২০০ প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যানার নিয়ে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানান।[ref]
২০১৮ এশিয়ান গেমস — ইতিহাসের সেই মুহূর্ত
২০১৮ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ কঠিন গ্রুপ B-তে পড়েছিল — কাতার, উজবেকিস্তান ও থাইল্যান্ডের সাথে। উজবেকিস্তানের কাছে বড় হারের পর থাইল্যান্ডের সাথে ড্র করে শেষ ম্যাচে কাতারের বিপক্ষে মাঠে নামে বাংলাদেশ। ম্যাচের ৯৩তম মিনিটে জামাল ভূঁইয়া বক্সের বাইরে থেকে একটি দুর্দান্ত লো-ড্রাইভ শটে গোল করে বাংলাদেশকে ১–০ ব্যবধানে জয় এনে দেন। এই গোলের ফলে বাংলাদেশ এশিয়ান গেমসের নকআউট পর্বে প্রথমবারের মতো উঠে ইতিহাস তৈরি করে।
২০২৩ SAFF চ্যাম্পিয়নশিপ — ১৪ বছর পর সেমিফাইনাল
জামালের অধিনায়কত্বে বাংলাদেশ ২০২৩ SAFF চ্যাম্পিয়নশিপে ভুটানকে ৩–১ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল পার হয় এবং ১৪ বছর পর প্রথমবার সেমিফাইনালে পৌঁছায়। সেমিফাইনালে কুয়েতের কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে বিদায় নিতে হলেও এটি বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য বড় অগ্রগতি।
La Liga স্টুডিও ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
২০১৯ সালের ১৮ মে La Liga স্টুডিওতে আমন্ত্রিত হয়ে Joe Morrison ও John Burridge-এর সাথে রিয়েল ভায়াদোলিদ বনাম ভ্যালেন্সিয়া ম্যাচের লাইভ কমেন্ট্রি করেন। এছাড়া SD Eibar বনাম FC Barcelona ম্যাচেও ধারাভাষ্যকার ছিলেন তিনি।
ব্যক্তিজীবন ও অনুপ্রেরণা
দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ক্রীড়াব্যক্তিত্ব হওয়ায় ঢাকায় তাঁর চলাফেরা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, অধিনায়ক হওয়ার পর থেকে জনগণ গাড়িতে টোকা দেন, হোটেলের সামনে অপেক্ষা করেন। তাঁকে বাংলাদেশের প্রজন্মের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তাঁর অনুপ্রেরণায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের "The Next Global Star" কার্যক্রমের আওতায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের জাতীয় দলে আনার উদ্যোগ শুরু হয়। ঢাকাভিত্তিক সাংবাদিক আতিক আনাম বলেন, "জামাল নিঃসন্দেহে তাঁর প্রজন্মের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাংলাদেশি ফুটবলার। তাঁর উপস্থাপনা, ডেনমার্কের জীবনের গল্প, যোগাযোগ দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা তাঁকে ফুটবলে আদর্শ মার্কেটিং মুখ করে তুলেছে।[ref]