হুমায়ূন আহমেদ
"হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সর্বাধিক পঠিত কথাসাহিত্যিক। তাঁর পিতা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হন, যা তাঁর লেখায় গভীর ছাপ ফেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপনা ছেড়ে সাহিত্যকে জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নেন। তাঁর সৃষ্ট হিমু ও মিসির আলি চরিত্র দুটি বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। কোলোরেক্টাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই নিউ ইয়র্কে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং তাঁর প্রিয় নুহাশ পল্লীতে চিরনিদ্রায় শায়িত হন।"
একনজরে
- জন্ম
- ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮
- জন্মস্থান
- মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা (পৈত্রিক: কুতুবপুর গ্রাম)
- পিতা ও মাতা
- ফয়জুর রহমান আহমেদ ও আয়েশা ফয়েজ
- শিক্ষা
- পিএইচডি — নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র (১৯৮২) · রসায়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- পেশা
- অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭৪–১৯৯০) · পরে পূর্ণকালীন সাহিত্যিক
- প্রথম উপন্যাস
- নন্দিত নরকে (১৯৭২)
- বিখ্যাত চরিত্র ও সিরিজ
- হিমু সিরিজ, মিসির আলি সিরিজ, শুভ্র সিরিজ, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমণি
- উল্লেখযোগ্য পুরস্কার
- একুশে পদক (১৯৯৪), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮১), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩, ১৯৯৪), লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩)।
- মৃত্যু
- ১৯ জুলাই ২০১২
- সমাধি
- নুহাশ পল্লী, গাজীপুর
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
হুমায়ূন আহমেদের জন্ম নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জে তাঁর মাতামহের বাড়িতে। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে। জন্ম তারিখ ছিল ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮। তাঁর পিতা ফয়জুর রহমান আহমেদ পুলিশ বিভাগে চাকরি করতেন এবং মা আয়েশা আখতার খাতুন, যিনি পরবর্তীকালে আয়েশা ফয়েজ নামে পরিচিত হন।
শৈশবে হুমায়ূন আহমেদের নাম ছিল শামসুর রহমান। তাঁদের পিতা ছেলেমেয়েদের নাম পরিবর্তন করতেন বলে তিনি নিজেই পুত্রের আগের নাম বদলে রাখেন হুমায়ূন আহমেদ। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে হুমায়ূন ছিলেন সবার বড়।
পারিবারিক পরিমণ্ডলে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার অনুকূল আবহে হুমায়ূন আহমেদের শৈশব কেটেছে। তাঁর পিতার সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ ছিল এবং তিনি সমকালীন পত্রপত্রিকায় লেখা প্রকাশ করতেন। সন্তানদেরও তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চার জন্য উৎসাহিত করতেন।
হুমায়ূনের অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক। তাঁর সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা আহসান হাবীব রম্যলেখক ও কার্টুন ম্যাগাজিন 'উন্মাদ'-এর সম্পাদক।[ref]
মুক্তিযুদ্ধে পিতার শাহাদাত ও নিজের অভিজ্ঞতা
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হুমায়ূনের পিতা পিরোজপুর মহকুমার এসডিপিও হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং কর্তব্যরত অবস্থায় পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হন। সঙ্গত কারণেই হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত ছিলেন। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী তাঁকে ধরে নিয়ে কিছুদিন আটকে রেখে দৈহিক নির্যাতন করে। পিতার শাহাদাত ও নিজের এই নির্মম অভিজ্ঞতা তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচনায় গভীর আবেগের উৎস হয়ে ওঠে।
শিক্ষাজীবন
পিতার সরকারি চাকরির সুবাদে হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সিলেট, জগদ্দল, পঞ্চগড়, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম, বগুড়া, কুমিল্লা ও পিরোজপুরে অবস্থান করেন। সিলেট জেলা শহরের কিশোরীমোহন পাঠশালায় তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা।
১৯৬৫ সালে তিনি বগুড়া জেলা স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন — রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। ১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি (সম্মান) এবং ১৯৭২ সালে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তী পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে ১৯৮২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।[ref]
কর্মজীবন
১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ময়মনসিংহ) প্রভাষক হিসেবে শুরু হয় হুমায়ূন আহমেদের কর্মজীবন। ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন। ১৯৯০ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি অধ্যাপনা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং সার্বক্ষণিক সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন।
সাহিত্যকর্ম
ছাত্রজীবনে লেখা 'নন্দিত নরকে' শিরোনামের উপন্যাসের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাব। ১৯৭২ সালে তিনি উপন্যাসটি রচনা করেন এবং সে বছরই গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস শঙ্খনীল কারাগার (১৯৭৩)।
গল্প, উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, শিশুতোষ গ্রন্থ, নাটক, প্রবন্ধ, আত্মজৈবনিক রচনা প্রভৃতি মিলিয়ে তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা তিন শতাধিক।
তাঁর সৃষ্টিকর্ম বিষয়ভেদে কয়েকটি ধারায় ভাগ করা যায়:
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচনা: শ্যামল ছায়া (১৯৭৪), আগুনের পরশমণি (১৯৮৬), অনিল বাগচীর একদিন (১৯৯২), জোছনা ও জননীর গল্প (২০০৪) প্রভৃতি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
হিমু সিরিজ: ময়ূরাক্ষী (১৯৯০) দিয়ে শুরু হওয়া হিমু সিরিজ তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র-ভিত্তিক রচনার ধারা। হিমু বেকার যুবকের প্রতিভূ একটি খেয়ালি চরিত্র — হলুদ জামা পরে, খালি পায়ে ঘুরে বেড়ায়, কথাবার্তা ও চিন্তাভাবনায় কিছুটা উদ্ভট, তবে সে সৎ ও বিবেকবান।
মিসির আলি সিরিজ: দেবী (১৯৮৫) দিয়ে শুরু এই সিরিজের মিসির আলি একজন যুক্তিবাদী মনস্তত্ত্ববিদ, যিনি আবেগের চেয়ে যুক্তিকে প্রাধান্য দেন এবং চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনার রহস্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় উন্মোচন করেন।
সায়েন্স ফিকশন: তোমাদের জন্য ভালোবাসা (১৯৭৩) থেকে শুরু করে ওমেগা পয়েন্ট (২০০০), দ্বিতীয় মানব (২০০২) পর্যন্ত বিস্তৃত এই ধারায় তিনি বাংলাদেশের সায়েন্স ফিকশনের পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত।[ref]
টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র
আশির দশকে বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটক ও ধারাবাহিক নাটকের ইতিহাসে তিনি আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তাঁর প্রথম ধারাবাহিক নাটক 'এইসব দিনরাত্রি' বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। এ ছাড়া বহুব্রীহি, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই, আজ রবিবার — এগুলো অন্যতম জনপ্রিয় ধারাবাহিক।
তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র আগুনের পরশমণি (১৯৯৫) এবং শেষ চলচ্চিত্র ঘেটুপুত্র কমলা (২০১২)। তাঁর চলচ্চিত্র শ্যামল ছায়া অস্কার একাডেমি পুরস্কারের সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে বাংলাদেশ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নির্বাচিত হয়।
ব্যক্তিজীবন ও নুহাশ পল্লী
১৯৭৩ সালে প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খানের নাতনি গুলতেকিন খানকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির তিন মেয়ে ও এক ছেলে। ২০০৩ সালে গুলতেকিনের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটার পর হুমায়ূন আহমেদ ২০০৫ সালে অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে বিয়ে করেন। হুমায়ূন-শাওন দম্পতির দুটি পুত্রসন্তান।
নিসর্গপ্রেমী হুমায়ূন আহমেদ গাজীপুরের পিরুজালি গ্রামে তাঁর প্রথম পুত্রের নামে 'নুহাশ পল্লী' স্থাপন করেন এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপে 'সমুদ্রবিলাস' নামে বাড়ি নির্মাণ করেন। প্রায় দু'শ প্রজাতির ঔষধি গাছ রোপণ করে তিনি নুহাশ পল্লীতে একটি উদ্যান গড়ে তোলেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
সৃজনশীলতার স্বীকৃতিস্বরূপ হুমায়ূন আহমেদ পেয়েছেন লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮১), মাইকেল মধুসূদন দত্ত পুরস্কার (১৯৮৭), হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩ ও ১৯৯৪) এবং একুশে পদক (১৯৯৪)।[ref]
মৃত্যু
২০১২ সালের ১৯ জুলাই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের বেলভ্যু হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গাজীপুরের 'নুহাশ পল্লী'তে তাঁকে সমাহিত করা হয়।[ref]