হানিফ সংকেত
"হানিফ সংকেত বাংলাদেশের টেলিভিশন জগতের এক সুপরিচিত ও বহুমুখী প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব। এ কে এম হানিফ নামেই তাঁর জন্ম হলেও তিনি “হানিফ সংকেত” নামে দেশজুড়ে অধিক পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর জন্ম নেওয়া এই জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব উপস্থাপক, লেখক, নির্মাতা, প্রযোজক, কৌতুকশিল্পী ও কণ্ঠশিল্পী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন। বিশেষ করে জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান ইত্যাদি নির্মাণ ও উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সমাজসচেতন বার্তা, ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনা ও সৃজনশীল বিনোদনের কারণে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হন।"
একনজরে
- জন্ম
- ২৩ অক্টোবর ১৯৫৮
- জন্মস্থান
- বরিশাল, বাংলাদেশ
- পিতা
- আব্দুল হাকিম হাওলাদার
- স্ত্রী
- সানজিদা হানিফ
- শিক্ষা
- উচ্চমাধ্যমিক: বরিশাল থেকে / উচ্চশিক্ষা: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET), ঢাকা
- পেশা
- টিভি উপস্থাপক, লেখক, পরিচালক, প্রযোজক, কমেডিয়ান, কণ্ঠশিল্পী, ভয়েস অ্যাক্টর
- প্রযোজনা সংস্থা
- ফাগুন অডিও ভিশন (নভেম্বর ১৯৯৪ থেকে)
- টিভি শো
- ইত্যাদি (১৯৮৯–বর্তমান), যদি কিছু মনে না করেন (অভিষেক), ঝলক, কথার কথা
- পুরস্কার
- একুশে পদক ২০১০ / স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬ / পরিবেশ পদক ২০১৪ (জাতীয়) / মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার — সেরা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
হানিফ সংকেত বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল হাকিম হাওলাদার ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি দুই বড় ভাই, এক বড় বোন এবং দুই ছোট বোনকে নিয়ে বড় হয়েছেন। তাঁর ছোট বোন জাহানারা বেগম ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মৃত্যুবরণ করেন।[ref]
শিক্ষাজীবন
হানিফ সংকেত উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET) থেকে পড়াশোনা করেছেন। দেশের সেরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করলেও তিনি পরবর্তীতে মিডিয়া ও পারফর্মিং আর্টসে পেশাদার জীবন গড়ে তোলেন।
টেলিভিশনে অভিষেক — "যদি কিছু মনে না করেন"
হানিফ সংকেত ১৯৮০-এর দশকে "যদি কিছু মনে না করেন" অনুষ্ঠানের মাধ্যমে টেলিভিশনে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন। বাংলাদেশের প্রথম সেরা টেলিভিশন অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত এই শোতে তাঁর অভিষেক হয় এবং সেখান থেকেই তিনি নিজস্ব মঞ্চ তৈরির অনুপ্রেরণা পান।
(ইত্যাদি ) বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসের এক অধ্যায়
ইত্যাদি একটি দীর্ঘস্থায়ী ম্যাগাজিন-ফরম্যাট টেলিভিশন অনুষ্ঠান, যা হানিফ সংকেত তৈরি করেন এবং ১৯৮৯ সালের ১ মার্চ বাংলাদেশ টেলিভিশনে (BTV) প্রথম প্রচারিত হয়। শুরু থেকেই তিনি অনুষ্ঠানের প্রধান লেখক, পরিচালক ও উপস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৪ সালে তিনি "ফাগুন অডিও ভিশন" নামে প্রযোজনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
ইত্যাদি বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী টেলিভিশন অনুষ্ঠান ৩৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্প্রচারিত হচ্ছে। বিভিন্ন সমীক্ষা, এমনকি BBC পরিচালিত সমীক্ষাতেও প্রতিটিতে ইত্যাদিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি শো হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের ৭৫ শতাংশ টিভি দর্শক এই অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।[ref]
ইত্যাদির ফরম্যাট ও বৈশিষ্ট্য
ইত্যাদির ফরম্যাটে রয়েছে ব্যঙ্গাত্মক স্কেচ, কমেডি সেগমেন্ট, সেলিব্রিটি সাক্ষাৎকার এবং সামাজিক সমস্যার ওপর আলোকপাত করা সাংস্কৃতিক অনুসন্ধান। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক সমস্যা তুলে ধরেছেন। প্রতিটি এপিসোডে সমসাময়িক ঘটনা ও বিতর্ক তুলে ধরা হয়, প্রায়ই হাস্যরস ও দৃশ্যমান সেগমেন্টের মাধ্যমে।
দুর্নীতি, সড়ক দুর্ঘটনা, বৃক্ষরোপণ এবং পাঠাভ্যাসের মতো বিষয়গুলোতে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। হানিফ সংকেত ইত্যাদিকে কমেডি শো নয়, বরং স্যাটায়ার-ভিত্তিক অনুষ্ঠান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন।[ref]
ঐতিহাসিক স্থানে শুটিং — নতুন মাত্রা
ইত্যাদিকে নতুন মাত্রা দিতে হানিফ সংকেত স্টুডিওর বাইরে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান ও গ্রামীণ এলাকায় শুটিং শুরু করেন। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য থেকে মৌলভীবাজারের সিলেট অঞ্চল, ঠাকুরগাঁও থেকে মোংলা সমুদ্রবন্দর দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ঐতিহ্য, শিল্প ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে। সিলেটের মৌলভীবাজারের মতো এলাকায় ৪০,০০০ পর্যন্ত দর্শক শুটিংয়ে সমবেত হয়েছেন।
বিদেশি নাগরিকদের ইত্যাদিতে ব্যবহার
৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে হানিফ সংকেত ইত্যাদিতে বিদেশি নাগরিকদের লোক-সংস্কৃতি, গ্রামীণ ক্রীড়া ও ইতিহাস তুলে ধরতে ব্যবহার করেছেন, পাশাপাশি কুসংস্কার ও সামাজিক অসংগতি নিয়েও কাজ করেছেন।
ফাগুন অডিও ভিশন ও অন্যান্য প্রযোজনা
ফাগুন অডিও ভিশন (FAV) হানিফ সংকেত ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রযোজনা সংস্থার অধীনে নাটক, টেলিভিশন বিজ্ঞাপন, শো ও সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ইত্যাদি ছাড়াও তিনি ঝলক, কথার কথা, ঈদ আনন্দ মেলা, প্রথম আলো পুরস্কার অনুষ্ঠান এবং বাংলা ভিশন বার্ষিকী অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেছেন। ২০০৫ সালে নেদারল্যান্ডসের EMS Films-এর সাথে যৌথ প্রযোজনায় "Bridging Two Worlds" নামে একটি টেলিভিশন প্রামাণ্যচিত্র পরিচালনা করেন।
সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নীতির দৃঢ়তা
হানিফ সংকেত অর্থের জন্য নয়, নাগরিক দায়বোধ থেকে কাজ করেন বলে পরিচিত। একটি মোবাইল কোম্পানি তাঁকে মডেলিংয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ইত্যাদিতে অনেক মানবিক গল্প তুলে ধরা হয়েছে। একবার এক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধকে ইত্যাদিতে দেখানো হয়েছিল যিনি হুইলচেয়ারে ৩৯টি জেলা ভ্রমণ করেছিলেন এবং বাচ্চাদের কাছে চানাচুর বিক্রি করে সংসার চালাতেন। সংকেত তাঁকে ইত্যাদিতে দেখান এবং দুই লাখ টাকা প্রদান করেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
মেরিল–প্রথম আলো সেরা উপস্থাপক (টানা ৮ বার)। একুশে পদক (বাংলাদেশের ২য় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার) ২০১০। জাতীয় পরিবেশ পদক (২০১৪) স্বাধীনতা পুরস্কার (বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার) ২০২৬।[ref]