স্যামসন এইচ চৌধুরী
"স্যামসন এইচ চৌধুরী (২৫ সেপ্টেম্বর ১৯২৫ — ৫ জানুয়ারি ২০১২) ছিলেন বাংলাদেশের একজন কিংবদন্তি ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি। ১৯৫৮ সালে পাবনার একটি ছোট ওষুধের দোকান থেকে তিন বন্ধুকে নিয়ে যে স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন, তা-ই পাঁচ দশকের অক্লান্ত পরিশ্রম ও অটল সততার মধ্য দিয়ে রূপ নেয় বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী স্কয়ার গ্রুপে। ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে টেক্সটাইল, হাসপাতাল থেকে মিডিয়া প্রতিটি খাতে তিনি প্রমাণ করেছেন যে ব্যবসায়িক সাফল্য ও নৈতিক মূল্যবোধ একসঙ্গে চলতে পারে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কয়ার গ্রুপ আজ ৬০,০০০-এরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান করছে এবং বার্ষিক হাজার কোটি টাকার টার্নওভার নিয়ে দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এগিয়ে চলেছে।"
একনজরে
- জন্ম
- ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯২৫
- জন্মস্থান
- আড়ুয়াকান্দি গ্রাম, গোপালগঞ্জ
- পিতা ও মাতা
- ইয়াকুব হোসাইন চৌধুরী ও লতিকা চৌধুরী
- স্ত্রী
- অনিতা চৌধুরী
- সন্তান
- স্যামুয়েল এস চৌধুরী, তপন চৌধুরী, অঞ্জন চৌধুরী, রত্না পাত্র
- শিক্ষা
- Scottish Church College, কলকাতা। Harvard University (Management Diploma)
- প্রতিষ্ঠান
- স্কয়ার গ্রুপ (প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান)
- মৃত্যু
- ৫ জানুয়ারি ২০১২
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
জন্ম ও শৈশব
১৯২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের আড়ুয়াকান্দি গ্রামে জন্ম নেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। বাবা ইয়াকুব হোসাইন চৌধুরী ও মা লতিকা চৌধুরী। ১৯৩২ সালে বাবার সঙ্গে তিনি পাবনার আতাইকুলায় চলে আসেন।
বাবা সরকারি মেডিকেল অফিসার হওয়ায় চাকরির সুবাদে বিভিন্ন জায়গায় বদলি হতেন। ফলে শৈশব থেকেই দেশের নানা অঞ্চলের মানুষ ও পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় ঘটে স্যামসনের। চান্দপুর মিশন স্কুলে পড়াশোনার হাতেখড়ি, পরে ময়মনসিংহের ভিক্টোরিয়া মিশন স্কুলে এবং সবশেষে কলকাতার নিকটে বিষ্ণুপুরের একটি মিশনারি স্কুলে পড়েন তিনি।[ref]
শিক্ষা, নৌবাহিনী ও যৌবনের সাহসিকতা
কলকাতার বিষ্ণুপুর উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে সিনিয়র কেমব্রিজ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি স্কুল থেকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে পরিবারকে না জানিয়েই মুম্বাইয়ে গিয়ে রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে যোগ দেন তিনি। রাডার অপারেটর হওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করায় চার দিন কারাবাসও ভোগ করেন। তবে দৃঢ় মানসিকতার কাছে হার মানতে হয় কর্তৃপক্ষকে।
১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নৌ-বিদ্রোহে অংশ নেন। বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ায় গ্রেপ্তার হয়ে পাঁচ দিন জেলে এবং এক মাস কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে থাকতে হয়। মুক্তির পর সরকারি চাকরির সুপারিশসহ ক্লিন সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।
১৯৪৭ সালে পাবনায় ডাক বিভাগে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। একই বছর অনিতা বিশ্বাসের সঙ্গে বিবাহ হয়। তবে একজন স্বপ্নবাজ মানুষের পক্ষে কেরানির চাকরিতে সন্তুষ্ট থাকা সম্ভব ছিল না।[ref]
উদ্যোক্তা জীবনের সূচনা: ফার্মেসি থেকে কারখানা
১৯৫২ সালে ডাক বিভাগের চাকরি ছেড়ে বাবার হোসেন ফার্মেসিতে বসতে শুরু করেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। বছর চারেক পর বাবার কাছ থেকে টাকা ধার করে পাবনার আতাইকুলাতেই 'ইসন্স' (ইয়াকুব অ্যান্ড সন্স) নামে ছোট ওষুধ কোম্পানি গড়েন।
স্বপ্নচারী স্যামসন বাবার সম্পত্তিতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাঁর ভেতরে সবসময়ই আরও বড় কিছু করার তাগিদ কাজ করত। বাবার ফার্মেসিই হয়ে ওঠে তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের প্রথম পাঠশালা।[ref]
স্কয়ারের জন্ম: চার বন্ধুর স্বপ্নের গল্প
১৯৫৮ সালে স্যামসন এইচ চৌধুরী তিন বন্ধু ডা. কাজী হারুনূর রশীদ, পি কে সাহা ও রাধাবিন্দ রায়কে নিয়ে মাত্র ২০ হাজার টাকায় পাবনায় স্কয়ার নামে ওষুধ কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। চার বন্ধুর সমান বিনিয়োগের কারণেই প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ হয় 'স্কয়ার'।
শুরুটা সহজ ছিল না ভাড়া করা একটি ছোট টিনের ঘরে মাত্র ১২ জন কর্মী নিয়ে প্রথম ওষুধ 'ইস্টন সিরাপ' তৈরি হয়েছিল। প্রথম তিন বছর কোনো মুনাফা আসেনি। বরং পুনরায় বিনিয়োগ করতে হয়েছিল। কিন্তু চতুর্থ বছরে সাফল্যের মুখ দেখে স্কয়ার, তারপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
স্কয়ারের নামকরণ সম্পর্কে স্যামসন চৌধুরীর ব্যাখ্যা ছিল চার বন্ধুর যৌথ উদ্যোগ এবং বর্গক্ষেত্রের অর্থ নির্ভুলতা ও পরিপূর্ণতা দুটি অর্থই একসঙ্গে ধারণ করে এই নাম।[ref]
স্কয়ার গ্রুপের বিস্তার: বহুমুখী শিল্পসাম্রাজ্য
১৯৮৫ সালে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস দেশীয় ও বহুজাতিক সব কোম্পানির মধ্যে বাজারে শীর্ষস্থান অধিকার করে।
স্যামসন চৌধুরীর দূরদর্শিতায় ১৯৮৮ সালে যাত্রা শুরু করে স্কয়ার টয়লেট্রিস, ১৯৯৪ সালে স্কয়ার টেক্সটাইল এবং ১৯৯৮ সালে অ্যাগ্রো কেমিক্যালস ইউনিট। এরপর একে একে স্কয়ার স্পিনিং, স্কয়ার নিট ফেব্রিক্স, স্কয়ার ফ্যাশনস, স্কয়ার ইনফরমেটিক্স ও স্কয়ার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।
২০১১ সালের হিসাবে স্কয়ার গ্রুপে কর্মরত ছিলেন প্রায় ৩৬,০০০ মানুষ এবং বার্ষিক টার্নওভার ছিল গড়ে ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।[ref]
ব্যবসায়িক দর্শন: গুণমান, সততা ও মানবকল্যাণ
স্যামসন চৌধুরীর জীবনের মূলমন্ত্র ছিল 'Quality everywhere'। ওষুধ হোক বা হাসপাতালের সেবা হোক সব ক্ষেত্রেই গুণগত মান বজায় রাখাই ছিল তাঁর অগ্রাধিকার।
স্কয়ারের কর্মীরা জানান প্রতিষ্ঠাতার বলে যাওয়া কথা 'তুমি যদি কখনো থেমে যাও, পেছনের কেউ না কেউ তোমাকে অতিক্রম করবেই' আজও প্রতিষ্ঠানের দর্শন হিসেবে অনুসরণ করা হয়।
সহকর্মীদের সঙ্গে একই মঞ্চে বসে দুপুরের খাবার খেতেন তিনি। কোনো বৈষম্য করতেন না। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও ওষুধ সহায়তা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু যখন বিত্তশালীদের রেশন কার্ড ফেরত দিতে বলেন, প্রথম ব্যবসায়ী হিসেবে তিনিই তা করেন।
ছেলে তপন চৌধুরী স্মৃতিচারণ করে বলেছেন — বাবা বলতেন, নীতি ছেড়ে যে ব্যবসা করে সে টিকতে পারে না। এবং তাঁর সেই কথাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে সেই সময়কার অনেক প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়।[ref]
সমাজসেবা ও ধর্মীয় কার্যক্রম
বাংলাদেশ ব্যাপটিস্ট চার্চ ফেলোশিপের সভাপতি হিসেবে তিনি এক ডজনেরও বেশি বার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত ১৪ বছর সম্মানিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ব্যাপটিস্ট ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্সের সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত খ্রিস্টান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (CCDB)-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৩ সাল থেকে কাইনোনিয়া প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০০৪ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। দুর্নীতিবিরোধী এই প্রতিষ্ঠানে দেশের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার পক্ষে সরব ছিলেন তিনি।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
১৯৯৮ সালে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স তাঁকে 'Business Executive of the Year' সম্মানে ভূষিত করে। ২০০০-২০০১ সালে The Daily Star ও DHL তাঁকে দেশের সেরা উদ্যোক্তা হিসেবে পুরস্কৃত করে। ২০১৩ সালে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন। ২০০৯-১০ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড স্কয়ার গ্রুপকে সর্বোচ্চ করদাতার পুরস্কার দেয়।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি এজেন্সি অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।[ref]
পারিবারিক জীবন ও উত্তরসূরি
স্যামসন এইচ চৌধুরীর সহধর্মিণী ছিলেন অনিতা চৌধুরী। তাঁদের চার সন্তান স্যামুয়েল এস চৌধুরী, তপন চৌধুরী, অঞ্জন চৌধুরী ও রত্না পাত্র। বাবার প্রয়াণের পর তাঁরাই স্কয়ার গ্রুপের নেতৃত্ব সামলাচ্ছেন।
তাঁর মৃত্যুকালীন সময়ে স্কয়ারের তালিকাভুক্ত দুই কোম্পানির বার্ষিক আয় ছিল ২,১৪৮ কোটি টাকার বেশি। পরবর্তী এক দশকে তা ২৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে এবং বর্তমানে গোটা গ্রুপের আয় ছাড়িয়েছে ১১,০০০ কোটি টাকা।[ref]
মৃত্যু ও চিরন্তন উত্তরাধিকার
২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৬ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পাবনার কাশিপুরে তাঁর নিজ খামারবাড়িতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
তাঁর প্রয়াণের পর স্কয়ার পরিবারের ৮১,০০০ সদস্য তাঁর দেখিয়ে যাওয়া পথ ধরেই এগিয়ে চলেছে। স্কয়ার আজ শুধু একটি ব্র্যান্ড নয়, গুণমানের প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে। পাবনার একটি ছোট ফার্মেসি থেকে শুরু হয়েছিল যে যাত্রা, তা পাঁচ দশকে পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পসাম্রাজ্যে। সততা ও গুণমানকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়া এই মানুষটি আজও বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের অনুপ্রেরণার সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।[ref]