Bio.bd Logo
সালমান শাহ
star অভিনেতা

সালমান শাহ

"সালমান শাহ, যার প্রকৃত নাম ছিল চৌধুরী মুহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই জনপ্রিয় অভিনেতা অল্প সময়ের মধ্যেই অভিনয় দক্ষতা, স্টাইল ও ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে দর্শকদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নেন। গণমাধ্যম ও ভক্তদের কাছে তিনি “বাংলাদেশি সিনেমার রাজপুত্র” এবং আধুনিক ঢালিউডের প্রথম সুপারস্টার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। মাত্র তিন বছরের ক্যারিয়ারে তিনি ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন, যার বেশিরভাগই বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক সফলতা অর্জন করে।"

edit_calendar 07 May, 2026 update আপডেট: 23 Jun, 2026 visibility 53

একনজরে

জন্ম
১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১
আসল নাম
চৌধুরী মুহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন
জন্মস্থান
দরিয়াপাড়া, সিলেট, বাংলাদেশ
মৃত্যু
৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬
সমাধিস্থল
শাহ জালাল দরগাহ কবরস্থান, সিলেট
পিতা / মাতা
কামারউদ্দিন চৌধুরী / নীলা চৌধুরী
শিক্ষা
প্রাথমিক: বায়রা মডেল হাই স্কুল, খুলনা / মাধ্যমিক: আরব মিশন স্কুল, ধানমন্ডি, ঢাকা (SSC ১৯৮৭) /উচ্চমাধ্যমিক: আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ / স্নাতক:মালেকা সায়েন্স কলেজ, ধানমন্ডি
পেশা
অভিনেতা, মডেল
অভিষেক
কেয়ামত থেকে কেয়ামত (১৯৯৩)
মৃত্যুর স্থান
নিউ ইস্কাটন গার্ডেন, ঢাকা
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

সালমান শাহ ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের দরিয়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কামারউদ্দিন চৌধুরী এবং মাতার নাম নীলা চৌধুরী (নিলুফার জামান)। তিনি পরিবারের বড় ছেলে এবং তাঁর আসল নাম ছিল শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। তাঁর ছোট ভাইয়ের নাম চৌধুরী মুহাম্মদ শাহরান ইভান।[ref]

শিক্ষাজীবন

সালমান শাহ প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন খুলনার বায়রা মডেল হাই স্কুলে। পরবর্তীতে ঢাকায় এসে ধানমন্ডির আরব মিশন স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৮৭ সালে SSC পাস করেন। HSC সম্পন্ন করেন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এবং স্নাতক ডিগ্রি নেন ধানমন্ডির মালেকা সায়েন্স কলেজ থেকে।

ক্যারিয়ারের সূচনা — মডেলিং ও টেলিভিশন

সালমান শাহ তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেন র‌্যাম্প মডেল হিসেবে এবং টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে মডেলিং করেন। টেলিভিশন ধারাবাহিক "পাথর সময়"-এর প্রথম পর্বের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবন শুরু হয়। এর বাইরে "আকাশ ছোঁয়া", "দোয়েল" এবং "স্বপ্নের পৃথিবী"-সহ আরও কিছু টেলিভিশন নাটকেও কাজ করেছিলেন।[ref]

কেয়ামত থেকে কেয়ামত — রাতারাতি তারকা (১৯৯৩)

১৯৯৩ সালে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের "কেয়ামত থেকে কেয়ামত" চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে সালমান শাহ রুপালি পর্দায় বিস্ফোরণ ঘটান। ছবিটি ছিল ১৯৮৮ সালের ভারতীয় চলচ্চিত্র "কেয়ামত সে কেয়ামত তক"-এর রিমেক, যেখানে তাঁর বিপরীতে ছিলেন মৌসুমী। এই একটিমাত্র ছবিতেই দর্শক তাঁকে অসীম ভালোবাসা দিলেন এবং বাংলাদেশি চলচ্চিত্রশিল্পে তিনি অত্যন্ত বিশেষ স্থান অর্জন করলেন।

উজ্জ্বল ক্যারিয়ার — ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬

১৯৯৫ সালে এম. এ. খালেক পরিচালিত "স্বপ্নের ঠিকানা" মুক্তি পায় যেখানে শাবনূরের বিপরীতে তাঁর অনবদ্য অভিনয় ছবিটিকে ঢালিউডের ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ ব্যবসা সফল ছবির মর্যাদা দেয়। ১৯৯৬ সালে মতিন রহমান পরিচালিত "তোমাকে চাই" ছিল আরেকটি ব্লকবাস্টার এর টাইটেল ট্র্যাক তরুণ প্রজন্মের কাছে চিরন্তন সংগীতে পরিণত হয়। তিনি বিক্ষোভ, দেনমোহর, সুজন সখি, স্বপ্নের ঠিকানা, এই ঘর এই সংসার, সত্যের মৃত্যু নেই এবং আনন্দ অশ্রু-সহ বহু বাণিজ্যসফল ছবিতে কাজ করেন। শাবনূরের সাথে তাঁর পর্দার রসায়ন ছিল অতুলনীয়  একসাথে তাঁরা ১৪টি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। এছাড়া মৌসুমীর সাথেও "দেনমোহর" ও "অন্তরে অন্তরে"-তে জনপ্রিয় জুটি গড়েছিলেন।

ফ্যাশন আইকন — যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব

সালমান শাহ শুধু অভিনয় করেননি — স্পাইকি চুলের স্টাইল, রঙিন জ্যাকেট এবং আধুনিক পোশাকের সমন্বয়ে এক নতুন ফ্যাশন স্টেটমেন্ট তৈরি করেন যা বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞরা বলেন, তাঁর মুখভঙ্গি, শারীরিক ভাষা, চরিত্রের সাথে মিলিয়ে পোশাক পরার ধরন এবং ফ্যাশন-সচেতনতা ছিল সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তিনি পাইওনিয়ার বাংলাদেশি অভিনেতা রাজ্জাকের উত্তরসূরি হিসেবে গণমাধ্যমে বিবেচিত হন এবং শাকিব খান, আরিফিন শুভো, শরিফুল রাজসহ অনেক অভিনেতা তাঁকে নিজেদের অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন।

সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকের অভিনেতা ও উত্তরাধিকার

তাঁর তিনটি চলচ্চিত্র — "স্বপ্নের ঠিকানা", "সত্যের মৃত্যু নেই" (১৯৯৬) এবং "কেয়ামত থেকে কেয়ামত" (১৯৯৩) — ঢালিউডের সর্বকালের সর্বোচ্চ ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান পেয়েছে। তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতা।

রহস্যময় মৃত্যু — ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকার নিউ ইস্কাটন গার্ডেনের ফ্ল্যাটে সালমান শাহকে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর স্ত্রী সামিরা হক পুলিশে জানান যে তিনি স্বামীকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেছেন। তাঁকে প্রথমে হোলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে গলায় দড়ির দাগ ও মুখ-পায়ে নীলাভ রং দেখা যায়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর জাতিকে স্তব্ধ করে দেয়। অভিনেত্রী ববিতা বলেন, "এখনও সালমানের স্মৃতি আমার সঙ্গে আছে... সে অনেক ভালো অভিনেতা ছিল।" পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তাঁকে বর্ণনা করেন "বাংলাদেশি সিনেমায় রোমান্টিক নায়কের ধারণাকে বদলে দেওয়া বিপ্লবী প্রতিভা" হিসেবে।[ref]

তদন্ত — আত্মহত্যা নাকি হত্যা?

পরিবারের দাবি: তাঁর পিতা কামারউদ্দিন চৌধুরী প্রথমে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা করেন, পরে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন। তাঁর মা নীলা চৌধুরী শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বলে আসছেন যে তাঁর ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। CID রিপোর্ট (১৯৯৭): ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর CID আত্মহত্যার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, যা ঢাকার CMM আদালত গ্রহণ করে। PBI রিপোর্ট (২০২০): ২০২০ সালে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (PBI) জানায় যে সালমান শাহ পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বৈবাহিক সমস্যা, সহশিল্পী শাবনূরের সাথে আবেগীয় জটিলতা এবং আগের একাধিক আত্মহত্যার চেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে নিজেই জীবন দিয়েছেন।

২০২৫ সালে হত্যা মামলা: ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন সেশন জজ মামলাটিকে হত্যা হিসেবে পুনরায় তদন্তের আদেশ দেন। সেই রাতেই সালমান শাহের মামা আলমগীর কুমকুম রমনা পুলিশ স্টেশনে স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনের নামে হত্যা মামলা দায়ের করেন। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সামিরা হক, তাঁর মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন এবং আরও কয়েকজন। তদন্ত এখনো চলমান।[ref]

সমাধি ও উত্তরাধিকার

সালমান শাহকে সিলেটের শাহ জালাল দরগাহ কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। তাঁর জন্মবার্ষিকীতে "সালমান শাহ স্মৃতি পরিষদ" প্রতি বছর উৎসব আয়োজন করে এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র আর্কাইভ নিয়মিতভাবে তাঁর ডিজিটালাইজড ছবির বিনামূল্যে প্রদর্শনী করে। ঢাকার FDC-তে তাঁর একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর ২৯ বছর পরেও জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকীতে ভক্তরা সিলেটে তাঁর সমাধিতে ভিড় করেন, নতুন প্রজন্মের ভক্তরা তাঁর ছবি দেখেন এবং তাঁকে নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি হয়।[ref]

জীবনীটি শেয়ার করুন

এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পটি অন্যদের সাথে ছড়িয়ে দিন।

Facebook WhatsApp