শেখ আকিজ উদ্দীন
"শেখ আকিজ উদ্দিন ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত শিল্পপতি, উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক। অতি সাধারণ জীবন থেকে উঠে এসে তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আকিজ গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি মানবসেবামূলক কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট/ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা ও সমাজকল্যাণে অবদান রাখেন। কর্মনিষ্ঠা, সততা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে তিনি বাংলাদেশের শিল্পখাতে এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।"
একনজরে
- জন্ম
- ১৯২৯, মধ্যডাঙ্গা, ফুলতলা, খুলনা
- পেশা
- শিল্পপতি, উদ্যোক্তা
- পিতা ও মাতা
- শেখ মফিজ উদ্দিন ও মতিনা বেগম
- সন্তান
- ১৫ (১০ পুত্র, ৫ কন্যা)
- প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান
- আকিজ গ্রুপ, আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট
- শিল্পখাত
- তামাক, চামড়া, সিমেন্ট, টেক্সটাইল, পাট, ফার্মাসিউটিক্যালস
- মৃত্যু
- ১০ অক্টোবর ২০০৬
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
প্রারম্ভিক জীবন ও শৈশব
১৯২৯ সালে খুলনার ফুলতলা উপজেলার মধ্যডাঙ্গা গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে শেখ আকিজ উদ্দিনের জন্ম। বাবা শেখ মফিজ উদ্দিন ছিলেন ক্ষুদ্র মৌসুমি ব্যবসায়ী আর মা মতিনা বেগম। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হিসেবে তিনি সবুজ-শ্যামল মধ্যডাঙ্গা গ্রামে বড় হন। চারদিকে তীব্র দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট পরিবারে স্কুলে যাওয়ার সুযোগটুকুও জোটেনি তাঁর।
বাবার কাছ থেকে ব্যবসার প্রাথমিক পাঠ নিয়েছিলেন আকিজ উদ্দিন। মৌসুমি পণ্য কেনাবেচার ছোট ব্যবসাই ছিল বাবার জীবিকা — সেখান থেকেই তাঁর মাথায় উদ্যোক্তার বীজ বপন হয়।[ref]
ফেরিওয়ালা থেকে উদ্যোক্তা: শুরুর গল্প
১৯৪২ সালে মাত্র ১৬ টাকা সম্বল নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। কলকাতার রাস্তায় কমলালেবু বিক্রি দিয়েই শুরু হয় তাঁর জীবনসংগ্রামের প্রথম অধ্যায়।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে গলায় ঝুড়ি ঝুলিয়ে কমলালেবুর ফেরিওয়ালা হিসেবে ব্যবসার হাতেখড়ি নেওয়া এই ছেলেটি শেষ পর্যন্ত দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পসাম্রাজ্যের স্রষ্টা হয়ে উঠেছিলেন। প্রথম দিকে কলকাতায় ব্যবসায় তেমন সুবিধা করতে পারেননি। শহর ও ব্যবসা বদলাতে হয়েছে কয়েকবার। তবু হার মানেননি। শেষ পর্যন্ত ১৯৫২ সালে নিজ ভূমিতে ফিরে বিড়ির ব্যবসা শুরু করলে পাল্টে যায় সব হিসাব। এই একটি সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।[ref]
আকিজ গ্রুপের উত্থান: শিল্পে শিল্পে সাম্রাজ্য
পঞ্চাশের দশকে বিড়ি ব্যবসা দিয়ে যাত্রা শুরু করে ধীরে ধীরে একাধিক শিল্পখাতে বিস্তার ঘটান আকিজ উদ্দিন। যশোরের অভয়নগরে ১৯৬০ সালে আধুনিক চামড়া কারখানা এসএএফ ইন্ডাস্ট্রিজ গড়ে তোলেন। এরপর ১৯৬৬ সালে ঢাকা টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রিজ, ১৯৭৪ সালে আকিজ প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড এবং ১৯৮০ সালে আকিজ ট্রান্সপোর্টিং এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করেন।
নব্বইয়ের দশকে প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা আরও দীর্ঘ হয় — আকিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরি (১৯৯২), আকিজ জুট মিল (১৯৯৪), আকিজ পার্টিকেল বোর্ড মিলস (১৯৯৬), আকিজ হাউজিং (১৯৯৭), আকিজ সিমেন্ট (২০০২) এবং আকিজ পেপার মিলস (২০০৫) — একের পর এক যোগ হতে থাকে নতুন উদ্যোগ।
২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক টার্নওভার দাঁড়ায় ৮৯ বিলিয়ন টাকায় এবং ৩৯০ মিলিয়ন ইউরো কর পরিশোধ করে দেশের বৃহত্তম স্থানীয় করদাতার মর্যাদা পায়, যা ছিল জাতীয় বাজেটের প্রায় দুই শতাংশ।[ref]
ব্যবসায়িক দর্শন ও চরিত্র
শেখ আকিজ উদ্দিন প্রচলিত ছাঁচের বাইরে গিয়ে নিজস্ব পথ তৈরি করেছিলেন। ব্যবসায়ী হিসেবে সাহসী হলেও ব্যয়ের ব্যাপারে ছিলেন চরম সংযমী। তাঁর সমস্ত সম্পদ বিনিয়োগ হয়েছে দেশের মাটিতে, বিদেশে বাড়ি বা গাড়ি কেনেননি। এমনকি ব্যাংকঋণ খেলাপির মতো প্রথাও তাঁর ছিল না।
ছেলে বশির উদ্দিনের স্মৃতিচারণে উঠে আসে — বাবার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, কিন্তু শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেই তিনি ব্যবসায় যুক্ত করতেন। সততা, ধৈর্য, মেধা আর সহনশীলতাকেই তিনি সাফল্যের মূল চাবিকাঠি মানতেন।
আকিজ গ্রুপ কখনো শেয়ারবাজারে যায়নি, জনগণের পুঁজি নেয়নি। লাভের অর্থেই নতুন বিনিয়োগ করা ছিল তাদের নীতি — ব্যাংকঋণের উপর নির্ভর না করেই গড়ে উঠেছে এই বিশাল সাম্রাজ্য।
সমাজসেবা: আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট
শেখ আকিজ উদ্দিনের অনুপ্রেরণায় ১৯৮০ সালে যশোর শহরে আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের যাত্রা শুরু হয়। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের আর্থসামাজিক ও স্বাস্থ্যগত উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই ট্রাস্ট এতিম শিশুদের পুনর্বাসন, বিনামূল্যে চোখের ছানি অপারেশন এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে আসছে।
ব্যক্তিগতভাবেও তিনি মসজিদ নির্মাণ, দরিদ্রদের আশ্রয় প্রদান এবং সমাজের অসহায় মানুষদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করতেন। তাঁর এই দানশীলতা স্থানীয়দের হৃদয়ে তাঁকে বিশেষ স্থান দিয়েছিল। বর্তমানে ঢাকা, যশোর, খুলনা ও কুষ্টিয়ায় আদ্-দ্বীনের চারটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল এবং চারটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে এগুলো সবই তাঁর স্বপ্নের ফসল।[ref]
পারিবারিক জীবন ও উত্তরসূরি
আকিজ উদ্দিন একাধিক বিবাহ করেছিলেন। তাঁর ১৫ সন্তান — ১০ পুত্র ও ৫ কন্যা।
নিজের উত্তরসূরিদের কথা ভেবেই তিনি নিজে স্বল্পশিক্ষিত হয়েও সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করেছেন। মৃত্যুর আগে নিজেই সমস্ত সম্পদ সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে গেছেন।
বড় ছেলে ডা. শেখ মহিউদ্দিন আদ্-দ্বীনের নির্বাহী পরিচালক, শেখ মোমিন উদ্দিন এসএএফ চামড়া ফ্যাক্টরির এমডি, শেখ আফিল উদ্দিন আফিল গ্রুপের কর্ণধার এবং শেখ বশির উদ্দিন আকিজ গ্রুপ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে তৃতীয় স্ত্রীর পাঁচ পুত্র — শেখ নাসির উদ্দিন, শেখ বশির উদ্দিন, শেখ জামিল উদ্দিন, শেখ জসিম উদ্দিন ও শেখ শামীম উদ্দিন — ২০২২ সাল পর্যন্ত একসঙ্গে আকিজ গ্রুপ পরিচালনা করেছেন। পরে প্রত্যেকে আলাদা আলাদা গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেছেন।[ref]
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
২০০৬ সালের ১০ অক্টোবর ৭৭ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
২০১৮ সালে আকিজ গ্রুপ তাদের তামাক বিভাগ জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল (JTI)-এর কাছে ১.৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি করে — যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একক বৃহত্তম বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ হিসেবে নথিভুক্ত।
মাত্র ১৬ টাকা পুঁজি আর অদম্য জিজীবিষা নিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল কলকাতার রাস্তায়, তা শেষ পর্যন্ত রূপ নিয়েছিল বাংলাদেশের শিল্পইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়ে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন এই মানুষটি প্রমাণ করেছেন সততা, পরিশ্রম আর দূরদৃষ্টিই হলো সবচেয়ে বড় পুঁজি।