শাহ আহমদ শফী
"শাহ আহমদ শফী ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামি ব্যক্তিত্ব ও কওমি ধারার শীর্ষ আলেম। ১৯৩০ সালের ৫ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করা এই ধর্মীয় নেতা দীর্ঘ সময় ধরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসা-এর মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। অনুসারীদের কাছে তিনি “বড় হুজুর” নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন এবং বাংলাদেশের কওমি শিক্ষা ও ধর্মীয় আন্দোলনের অন্যতম প্রধান অভিভাবক হিসেবে সম্মানিত হতেন।"
একনজরে
- জন্ম
- ৫ এপ্রিল ১৯৩০ (মতান্তরে ১৯১৬)
- জন্মস্থান
- রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
- মৃত্যু
- ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
- সমাধিস্থল
- হাটহাজারী মাদরাসা প্রাঙ্গণ, চট্টগ্রাম
- ধর্ম
- ইসলাম
- শিক্ষা
- প্রাথমিক: পারিবারিক শিক্ষা ও স্থানীয় মাদরাসা / মাধ্যমিক: আল-জামিয়াতুল আরাবিয়াতুল ইসলামিয়া, জিরি / উচ্চমাধ্যমিক: দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী (১০ বছর) / উচ্চশিক্ষা: দারুল উলুম দেওবন্দ, ভারত (হাদিস ও তাফসির, ৪ বছর)
- পদ ও দায়িত্ব
- মহাপরিচালক: হাটহাজারী মাদরাসা (১৯৮৬–২০২০) / প্রতিষ্ঠাতা: আমির হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ (২০১০) / চেয়ারম্যান: বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (কওমি শিক্ষা বোর্ড)
- উল্লেখযোগ্য অবদান
- হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা ২০১০ / কওমি সনদ স্বীকৃতি ২০১৭ / ঢাকা অবরোধ সমাবেশ ২০১৩ / সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ বিবৃতি ২০০৯ / ফায়জুল জারি (বুখারি শরহ)
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
শাহ আহমদ শফী চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তিনি পরিবার থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। হাটহাজারী উপজেলার নোতুয়ারতিলা গ্রামে তাঁর পারিবারিক বাড়ি ছিল। ছোটবেলা থেকেই ইসলামি জ্ঞানের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।[ref]
শিক্ষাজীবন
প্রাথমিক পড়াশোনার পর তিনি আল-জামিয়াতুল আরাবিয়াতুল ইসলামিয়া, জিরিতে ভর্তি হন। এরপর ১০ বছর বয়সে হাটহাজারী মাদরাসায় ভর্তি হন এবং সেখানে টানা ১০ বছর পড়াশোনা করেন। হাদিস ও তাফসির বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে যান এবং সেখানে চার বছর অধ্যয়নের পর স্বদেশে ফেরেন।[ref]
কর্মজীবন ও হাটহাজারী মাদরাসার নেতৃত্ব
দেওবন্দ থেকে ফিরে শাহ আহমদ শফী হাটহাজারী মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৮৬–৮৭ সালে তিনি হাটহাজারী মাদরাসার রেক্টর (মহাপরিচালক) নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। এই মাদরাসায় ৭,০০০ এরও বেশি শিক্ষার্থী দেওবন্দি ইসলামের আদর্শে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। তিনি বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড "বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ"-এর চেয়ারম্যানও ছিলেন।
হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা (২০১০)
২০১০ সালে শাহ আহমদ শফী বিভিন্ন কওমি মাদরাসা গোষ্ঠীকে একত্রিত করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। সরকারের প্রস্তাবিত জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালায় নারীদের সমান উত্তরাধিকার সুবিধার বিধানের প্রতিবাদ জানিয়ে সংগঠনটি প্রথমবার জনসম্মুখে আসে।
২০১৩ সালের ঢাকা অবরোধ ও ১৩ দফা দাবি
২০১৩ সালের মে মাসে শাহ আহমদ শফী তাঁর লক্ষাধিক অনুসারীকে ঢাকার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন, কঠোর ধর্মনিন্দা আইন এবং নাস্তিক ব্লগারদের মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানান। হেফাজতের ১৩ দফা দাবির মধ্যে ছিল সংবিধানে "আল্লাহর প্রতি আস্থা" পুনঃস্থাপন, ধর্মনিন্দার জন্য মৃত্যুদণ্ড, নারী শিক্ষানীতি বাতিল এবং আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা। ওই সমাবেশ হিংসাত্মক রূপ নেয় এবং মতিঝিল এলাকায় অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কমপক্ষে ৩৯ জন নিহত হন।
কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি (২০১৭)
২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি "দাওরায়ে হাদিস"-কে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমতুল্য স্বীকৃতি দেন এবং শাহ আহমদ শফীর উপস্থিতিতে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে এক শোকরানা মাহফিলে শফী শেখ হাসিনাকে "কওমির মা" উপাধিতে ভূষিত করেন।
শেষ জীবন, পদত্যাগ ও মৃত্যু
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষার্থীরা শফীর পুত্র আনাস মাদানির বিরুদ্ধে এবং শফীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনের মুখে আনাস মাদানি বহিষ্কৃত হন এবং শফী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পরপরই তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয় এবং তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ সালে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকার আসগর আলী হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সন্ধ্যা ৬টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জানাজায় প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ হাটহাজারী মাদরাসা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ তাঁর স্মরণে শোক প্রস্তাব পাস করে।[ref]
রচনাবলি
শাহ আহমদ শফী সারাজীবনে বহু ইসলামি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ফায়জুল জারি — বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ বুখারি শরিফের ব্যাখ্যামূলক রচনা। তিনি বাংলা, আরবি ও উর্দুতে নয়টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেন, যেগুলো মূলত হাদিস ব্যাখ্যা, আকিদা ও ফিকহ বিষয়ক।
উত্তরাধিকার ও মূল্যায়ন
ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন ইসলামি মূল্যবোধের সংরক্ষক, আর সমালোচকদের কাছে "তেঁতুল হুজুর" নামে পরিচিত ছিলেন — বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে পিছিয়ে দেওয়ার প্রতীক হিসেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞানের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, শফী এবং হেফাজত প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন, তাই তাঁর মৃত্যুর পর সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।[ref]