রুনা লায়লা
"রুনা লায়লা দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতাঙ্গনের এক কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী, যিনি দীর্ঘদিন ধরে তাঁর মধুর কণ্ঠ ও বৈচিত্র্যময় গানের জন্য শ্রোতাদের হৃদয় জয় করে আসছেন। ১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর জন্ম নেওয়া এই খ্যাতিমান শিল্পী প্লেব্যাক সিঙ্গার ও সুরকার হিসেবে অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি “সুরের রানি” নামে সমধিক পরিচিত। বাংলা ছাড়াও বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়ে তিনি বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ভারত-এ ব্যাপক খ্যাতি লাভ করেন।"
একনজরে
- জন্ম
- ১৭ নভেম্বর ১৯৫২
- জন্মস্থান
- সিলেট, পূর্ব বাংলা, ডোমিনিয়ন অব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)
- পিতা / মাতা
- সৈয়দ মুহাম্মদ ইমদাদ আলী / আমিনা লায়লা
- বর্তমান স্বামী
- অভিনেতা আলমগীর
- শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ
- বিদ্যালয়ঃ সেন্ট লরেন্স কনভেন্ট, করাচি / নৃত্যশিক্ষাঃ কত্থক ও ভরতনাট্যম, বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস, করাচি / সঙ্গীতগুরুঃ উস্তাদ আব্দুল কাদের পেয়ারাং, উস্তাদ হাবিবুদ্দিন আহমেদ
- পেশা
- প্লেব্যাক সিঙ্গার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক
- উল্লেখযোগ্য পুরস্কার
- স্বাধীনতা পুরস্কার ১৯৭৭ (বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান) / জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার — সেরা প্লেব্যাক ৭ বার (রেকর্ড) / জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার — সেরা সুরকার ২০১৮ / গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড — ৩ দিনে ৩০টি গান রেকর্ড / গোল্ডেন ডিস্ক অ্যাওয়ার্ড ১৯৮২ (Superuna অ্যালবাম) / স্বাধীনতা পুরস্কার ২০০৪ (দ্বিতীয়বার)
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
রুনা লায়লা সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ মুহাম্মদ ইমদাদ আলী রাজশাহীর বাঙালি মুসলিম পরিবারের সন্তান এবং সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সিলেট ও করাচিসহ বিভিন্ন শহরে কর্মরত ছিলেন। তাঁর মাতা আমিনা লায়লা (জন্মনাম আনিতা সেন) উচ্চ আসামের এক বাঙালি হিন্দু পরিবারের মেয়ে এবং নিজেও একজন সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন। তাঁর মামা সুবীর সেন ছিলেন ভারতের একজন বিখ্যাত প্লেব্যাক সিঙ্গার। রুনার বড় বোন দিনা লায়লাও একজন গায়িকা ছিলেন। বাড়িতে সঙ্গীতের উস্তাদ আসতেন দিনাকে ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত শেখাতে। ছোট্ট রুনা পাশে বসে অনায়াসে সব তুলে নিতেন।[ref]
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ
শৈশবে রুনা কত্থক ও ভরতনাট্যম নৃত্যের প্রশিক্ষণ নেন। করাচির সেন্ট লরেন্স কনভেন্টে পড়াকালীন তিনি পাকিস্তানের আন্তঃবিদ্যালয় সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করেন। তিনি ও তাঁর বোন উস্তাদ আব্দুল কাদের পেয়ারাং এবং উস্তাদ হাবিবুদ্দিন আহমেদের কাছে সঙ্গীতের তালিম নেন।
গানের দুনিয়ায় হাতেখড়ি — এক আকস্মিক সূচনা
রুনা লায়লার সঙ্গীতজীবন শুরু হয়েছিল এক দুর্ঘটনার মতো। একটি অনুষ্ঠানে বড় বোন দিনার গান গাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেদিন গলায় ব্যথার কারণে তিনি গাইতে পারলেন না। তখন ছোট রুনাকে মঞ্চে পাঠানো হলো। সে এতটাই ছোট ছিল যে 'তানপুরা' ধরতেই পারছিল না — আড়াআড়ি ধরে একটি খেয়াল গেয়ে সকলকে মুগ্ধ করে ফেলল। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি উর্দু ছবি "জুগনু"-তে একটি পুরুষ শিশু অভিনেতার জন্য "গুড়িয়া সি মুন্নি মেরি" গানটিতে প্লেব্যাক করেন — এটি ছিল তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র গান।[ref]
পাকিস্তানি সিনেমায় উজ্জ্বল উত্থান (১৯৬৬–১৯৭৪)
১৯৬৬ সালে উর্দু ছবি "হাম দোনো"-তে "উনকি নজরোঁ সে মুহব্বত কা জো পয়গাম মিলা" গানটির মাধ্যমে তিনি পাকিস্তানি চলচ্চিত্রশিল্পে বিস্ফোরণ ঘটান। পাকিস্তান টেলিভিশনে (PTV) "বজমে লায়লা" নামে তাঁর নিজস্ব অনুষ্ঠান ছিল। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি করাচির বিখ্যাত "জিয়া মহিউদ্দিন শো"-তে নিয়মিত পারফর্ম করেছেন। সেই সময়কার পাকিস্তানি চলচ্চিত্রসংগীতে আহমেদ রুশদির পরেই সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিবান শিল্পী হিসেবে তাঁর নাম উচ্চারিত হতো।[ref]
বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন ও বাধার মুখে টিকে থাকা
১৯৭৪ সালে পরিবারের সাথে বাংলাদেশে ফিরে আসেন রুনা লায়লা। দেশে ফিরে তিনি স্থানীয় সঙ্গীতশিল্পীদের একটি অংশের বিরোধিতার মুখে পড়েন কেউ কেউ একমঞ্চে তাঁর সাথে গান করতে অস্বীকার করেন। কিন্তু দর্শক তাঁকে ভালোবেসেছিলেন, সঙ্গীতপরিচালকরা তাঁর সাথে কাজ করতে চেয়েছিলেন। বয়কট টেকেনি। রুনা নিজেই বলেছিলেন, "আমার জীবন আমার গান এবং আমার পরিবার।"
ভারতে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা
১৯৭৪ সালে মুম্বাইয়ে তাঁর প্রথম কনসার্ট হয় এবং দিল্লিতে পরিচালক জয়দেবের সাথে পরিচয়ের সুবাদে তিনি ভারতীয় সম্প্রচার সংস্থা দূরদর্শনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করার সুযোগ পান। ১৯৭৬ সালে কল্যাণজি-আনন্দজির সুরে "এক সে বড়কর এক" ছবির টাইটেল গান দিয়ে তাঁর হিন্দি চলচ্চিত্রে আনুষ্ঠানিক অভিষেক হয়। ভারতে তিনি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হন "ও মেরা বাবু চাইল চাবিলা" এবং বিখ্যাত সুফি গান "দামা দাম মস্ত কালান্দার"-এর জন্য। এই গানটি গাওয়ার পর ভারতে তাঁকে "মস্ত কালান্দার গার্ল" উপাধি দেওয়া হয়।[ref]
গিনেস রেকর্ড ও "সুপার রুনা" অ্যালবাম
রুনা লায়লার নাম গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে উঠেছে মুম্বাইয়ে মাত্র তিন দিনে ৩০টি গান রেকর্ড করার কারণে। "এটা আমার ক্যারিয়ারের একটা মাইলফলক," রুনা নিজেই বলেছেন। ১৯৮২ সালে বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে তৈরি তাঁর অ্যালবাম "সুপার রুনা" প্রথম দিনেই এক লক্ষের বেশি কপি বিক্রি হয় এবং এই অর্জনের জন্য তিনি গোল্ডেন ডিস্ক অ্যাওয়ার্ড পান।[ref]
বাংলা গান — সাধের লাউ থেকে আল্লাহ মেঘ দে
১৯৭৬ সালে সত্য সাহার সুরে "জীবন সাথী" ছবিতে "ও আমার জীবন সাথী" গানটির মাধ্যমে তাঁর বাংলা গানে অভিষেক হয়। এরপর "শাধের লাউ বানাইলো মোরে বৈরাগী", "আল্লাহ মেঘ দে পানি দে", "বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িতে গেলাম" এই গানগুলো বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ উভয়েই চিরন্তন জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
পুরস্কার ও সম্মাননা
রুনা লায়লার মতে, তিনি যে সম্মান সবচেয়ে বেশি মূল্য দেন তা হলো ১৯৭৭ সালে পাওয়া বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার। তিনি "দ্য রেইন" (১৯৭৬), "জাদুর বাঁশি" (১৯৭৭), "অ্যাক্সিডেন্ট" (১৯৮৯) এবং "অন্তরে অন্তরে" (১৯৯৪)-সহ বিভিন্ন ছবিতে সেরা নারী প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে মোট সাতবার বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন — যা একটি রেকর্ড। "একটি সিনেমার গল্প" (২০১৮) ছবির জন্য তিনি সেরা সুরকারের জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন। রুনা লায়লা SAARC গুডউইল অ্যাম্বাসেডর ফর HIV/AIDS পদে নিযুক্ত প্রথম বাংলাদেশি।[ref]
সমাজসেবা — বোনের স্মৃতিতে ক্যান্সার হাসপাতাল
১৯৭৬ সালে বোন দিনা ক্যান্সারে মারা যাওয়ার পর রুনা ঢাকায় ছয়টি দাতব্য কনসার্ট আয়োজন করেন। সেই কনসার্ট থেকে সংগৃহীত সম্পূর্ণ অর্থ ঢাকার একটি শিশু হাসপাতালে ক্যান্সার ওয়ার্ড নির্মাণে দান করা হয়, যা বোনের নামে "দিনা ওয়ার্ড" নামে পরিচিত।
ব্যক্তিত্ব ও ফ্যাশন আইকন
রুনা লায়লা সঙ্গীতের পাশাপাশি ফ্যাশনেও সবসময় অগ্রগামী ছিলেন। বিশের দশকে "বজমে লায়লা" অনুষ্ঠানে শার্ট-প্যান্ট বা ম্যাক্সি পরে মঞ্চে আসতেন সেই রক্ষণশীল সময়ে যা ছিল অত্যন্ত সাহসী। তিনি নিজের পোশাক নিজেই ডিজাইন করেন।