তারেক মাসুদ
"তারেক মাসুদ ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার ও সাংস্কৃতিক চিন্তাবিদ। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন ধারার সূচনা করেন, যাকে সাধারণত “বিকল্পধারার চলচ্চিত্র” বলা হয়। তাঁর চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মীয় বাস্তবতা, লোকসংস্কৃতি, সামাজিক পরিবর্তন ও মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব গভীরভাবে উঠে এসেছে। তিনি শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি; বরং চলচ্চিত্রকে সমাজ ও ইতিহাস বোঝার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বিশ্বচলচ্চিত্রে বাংলাদেশের পরিচিতি গড়ে তুলতে তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তাঁর নির্মিত মাটির ময়না আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে এবং বাংলাদেশি সিনেমাকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করে তোলে।"
একনজরে
- জন্ম
- আবু তারেক মাসুদ ৬ ডিসেম্বর ১৯৫৬
- মৃত্যু
- ১৩ আগস্ট ২০১১ (বয়স ৫৪)
- মৃত্যুর কারণ
- সড়ক দুর্ঘটনা সমাধি নূরপুর, ভাঙ্গা উপজেলা, ফরিদপুর
- সমাধি
- সমাধি নূরপুর, ভাঙ্গা উপজেলা, ফরিদপুর
- জাতীয়তা
- বাংলাদেশী
- নাগরিকত্ব
- বাংলাদেশ
- শিক্ষা
- স্নাতকোত্তর
- পেশা
- চলচ্চিত্র পরিচালক প্রযোজকচিত্র নাট্যকার লেখক গীতিকার
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
পরিচয়
তারেক মাসুদ ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার ও সাংস্কৃতিক চিন্তাবিদ। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন ধারার সূচনা করেন, যাকে সাধারণত “বিকল্পধারার চলচ্চিত্র” বলা হয়।
তাঁর চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মীয় বাস্তবতা, লোকসংস্কৃতি, সামাজিক পরিবর্তন ও মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব গভীরভাবে উঠে এসেছে। তিনি শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি; বরং চলচ্চিত্রকে সমাজ ও ইতিহাস বোঝার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
বিশ্বচলচ্চিত্রে বাংলাদেশের পরিচিতি গড়ে তুলতে তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তাঁর নির্মিত মাটির ময়না আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে এবং বাংলাদেশি সিনেমাকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করে তোলে।
জন্ম ও শৈশব
তারেক মাসুদের পূর্ণ নাম ছিল আবু তারেক মাসুদ। তিনি ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মশিউর রহমান মাসুদ এবং মাতা নুরুন নাহার মাসুদ।
শৈশবে তিনি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশ, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও লোকজ জীবন তাঁর মানসিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনে একটি বড় পরিবর্তন আনে। যুদ্ধের পর তিনি সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরে আসেন। তাঁর শৈশবের মাদ্রাসাজীবনের অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে মাটির ময়না চলচ্চিত্রে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।[ref] .
শিক্ষাজীবন
মাদ্রাসা শিক্ষার পর তিনি স্কুলে ভর্তি হন এবং পরে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ ও নটর ডেম কলেজে পড়াশোনা করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকেই তিনি চলচ্চিত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। এই সময়ে তাঁর মধ্যে চলচ্চিত্রকে শিল্প ও সমাজপরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।
তিনি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং বিশ্বচলচ্চিত্র নিয়ে গভীর অধ্যয়ন করেন। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির তাঁর ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলেছিলেন।[ref] .
চলচ্চিত্রজীবনের শুরু
১৯৮২ সালে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স সম্পন্ন করার পর তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে পুরোপুরি যুক্ত হন।
তাঁর প্রথম বড় কাজ ছিল প্রখ্যাত শিল্পী এস এম সুলতান-এর জীবন নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র—
আদম সুরত (১৯৮৯)
এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে তাঁর প্রায় সাত বছর সময় লাগে। চলচ্চিত্রটি শুধু একজন শিল্পীর জীবন নয়; বরং বাংলার মাটি, মানুষ ও শিল্পচেতনার এক অনন্য দলিল হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র
তারেক মাসুদের অন্যতম বড় অবদান হলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ।
মুক্তির গান (১৯৯৫)
এই চলচ্চিত্রে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি সাংস্কৃতিক দলের কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়। মার্কিন নির্মাতা লিয়ার লেভিনের ধারণ করা আসল ফুটেজ ব্যবহার করে ছবিটি নির্মাণ করা হয়।
চলচ্চিত্রটি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিজ্যুয়াল দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। পরে তিনি নির্মাণ করেন—
- মুক্তির কথা
- নারীর কথা
যেখানে সাধারণ মানুষের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরা হয়েছে।
“মাটির ময়না” ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি
তারেক মাসুদের সবচেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্র হলো—
মাটির ময়না (২০০২)
এই চলচ্চিত্রটি তাঁর আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। এখানে এক মাদ্রাসাপড়ুয়া কিশোরের চোখে পাকিস্তান আমলের সমাজ, ধর্মীয় শিক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পরিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে।
4
চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা অর্জন করে। এটি ছিল প্রথম বাংলাদেশি বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র, যা অস্কারের বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া হয়। [ref].
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র
তারেক মাসুদের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- অন্তর্যাত্রা
- রানওয়ে
- সোনার বেড়ি
- আ কাইন্ড অব চাইল্ডহুড
বিশেষ করে রানওয়ে চলচ্চিত্রে তিনি নগরজীবন, দারিদ্র্য, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও তরুণদের সংকট অত্যন্ত বাস্তবভাবে তুলে ধরেন।
ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে কাজ
তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী ছিলেন।
তাঁরা একসঙ্গে “অডিওভিশন” নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রাম ও শহরে ঘুরে ঘুরে তাঁরা চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন। এজন্য অনেকে তারেক মাসুদকে “চলচ্চিত্রের ফেরিওয়ালা” বলেও অভিহিত করেন।
চলচ্চিত্রভাবনা ও দর্শন
তারেক মাসুদ বিশ্বাস করতেন—
“চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন নয়, এটি মানুষের ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের ভাষা।”
তাঁর চলচ্চিত্রে দেখা যায়—
- লোকজ সংস্কৃতি
- ধর্ম ও সমাজ
- মুক্তিযুদ্ধ
- মানবিকতা
- রাজনৈতিক বাস্তবতা
- প্রান্তিক মানুষের জীবন
তিনি বাণিজ্যিকতার বাইরে গিয়ে শিল্পমানসম্পন্ন ও চিন্তাশীল সিনেমা নির্মাণে বিশ্বাসী ছিলেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
তারেক মাসুদ দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কার অর্জন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- কান চলচ্চিত্র উৎসবের ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট সম্মাননা
- জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার
- বাচসাস পুরস্কার
- মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার
মরণোত্তর ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে। [ref].
মৃত্যু
২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ নিহত হন। একই দুর্ঘটনায় বিশিষ্ট সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর-ও মারা যান।
তাঁর অকালমৃত্যু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে গভীর শোকের সৃষ্টি করে। অনেকেই মনে করেন, তিনি আরও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকলে বাংলা চলচ্চিত্রকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারতেন।