জিয়াউর রহমান
"জিয়াউর রহমান (১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬ — ৩০ মে ১৯৮১) ছিলেন বাংলাদেশের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সফল সামরিক কর্মকর্তা এবং নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করেন এবং বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বেসরকারি খাতের বিকাশ ও গ্রামীণ উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি।"
একনজরে
- জন্ম
- ১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬
- জন্মস্থান
- বাগবাড়ী, গাবতলী, বগুড়া
- পিতা
- মনসুর রহমান
- স্ত্রী
- বেগম খালেদা জিয়া
- সন্তান
- তারেক রহমান, আরাফাত রহমান কোকো
- খেতাব
- বীর উত্তম
- প্রতিষ্ঠিত দল
- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
- মৃত্যু
- ৩০ মে ১৯৮১
- মৃত্যুস্থান
- চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার বাগবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। বাবা মনসুর রহমান কলকাতার একটি সরকারি দপ্তরে রসায়নবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর শৈশব কেটেছে একদিকে বগুড়ার গ্রামাঞ্চলে, অন্যদিকে কলকাতার শহুরে পরিবেশে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বাবা করাচিতে চলে গেলে জিয়াকেও কলকাতার হেয়ার স্কুল ছেড়ে করাচির একাডেমি স্কুলে ভর্তি হতে হয়। করাচিতে পড়াশোনা শেষ করে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দেন এবং ১৯৫৩ সালে কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।[ref]
সামরিক জীবন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস গণহত্যা শুরু হলে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে বিদ্রোহ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন জিয়াউর রহমান। এই ঘোষণা দেশজুড়ে মুক্তিকামী মানুষের মনে নতুন উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এবং পরে 'জেড ফোর্স'-এর অধিনায়ক হিসেবে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও রাঙামাটিসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সফলভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সামরিক ক্যারিয়ার
স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমানকে কুমিল্লায় ৪৪তম ব্রিগেডের কমান্ডার নিয়োগ করা হয়। ১৯৭২ সালের জুনে তিনি কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং ১৯৭৩ সালে ব্রিগেডিয়ার হন।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঘটনাবহুল সময়ে তাঁকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে গৃহবন্দী করা হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীতে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে এই সিদ্ধান্ত চরম প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। পরে ৭ই নভেম্বর সিপাহী-জনতার পাল্টা অভ্যুত্থানে তিনি মুক্তি পান এবং পুনরায় সামরিক নেতৃত্বে আসেন। [ref]
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ ও বিএনপি প্রতিষ্ঠা
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরের বছর ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে বৈধতা অর্জন করেন।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই দল দ্রুতই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠে। বর্তমানে তাঁর পুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই দলের চেয়ারম্যান।[ref]
বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার
রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং তথ্যমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলেই দেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হবে।
তাঁর শাসনামলে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয় এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা হয়।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম
জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজ গঠনে কিছু মূল সংস্কারের নেতৃত্ব দেওয়ার কৃতিত্ব দেওয়া হয়। বাণিজ্যের উদারীকরণ, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের ভিত্তি স্থাপন তাঁর অর্থনৈতিক নীতির মূল স্তম্ভ ছিল।
গ্রামীণ উন্নয়নে তিনি খাল খনন কর্মসূচি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের উদ্যোগ, গণশিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনার সম্প্রসারণ, গ্রাম সরকার ব্যবস্থা এবং যুব উন্নয়ন কর্মসূচিসহ একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
সেচ ব্যবস্থার বিস্তারে স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারি সহায়তার সমন্বয়ে সারাদেশে প্রায় ১,৪০০ খাল খনন ও পুনর্খনন করা হয়, যা কৃষি উৎপাদনে নতুন গতি আনে।
পারিবারিক জীবন
জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া, যিনি পরবর্তীতে দুইবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের দুই পুত্র — বড় ছেলে তারেক রহমান বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারম্যান এবং ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালে প্রয়াত হন।
শাহাদাত ও উত্তরাধিকার
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্যের হাতে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তাঁর জীবনের অকাল সমাপ্তি ঘটে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শ, দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক দর্শন বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের যে ধারণা তিনি প্রবর্তন করেছিলেন, তা আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তি।
২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার শ্রোতা জরিপে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি'র তালিকায় ১৯তম স্থান পান জিয়াউর রহমান।[ref]