জাফরুল্লাহ চৌধুরী
"জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব ও মানবসেবায় নিবেদিতপ্রাণ সমাজসংস্কারক। ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া এই চিকিৎসক গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার পথ উন্মুক্ত করেন। বিশেষ করে ১৯৮২ সালের বাংলাদেশ জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়নে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেশীয় ওষুধ শিল্প ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনে দেয়। দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আজীবন কাজ করায় তিনি “গণমানুষের ডাক্তার” নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।"
একনজরে
- জন্ম
- ২৭ ডিসেম্বর ১৯৪১
- জন্মস্থান
- কয়েপাড়া গ্রাম, রাউজান উপজেলা, চট্টগ্রাম
- মৃত্যু
- ১১ এপ্রিল ২০২৩ (বয়স ৮১), গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল, ঢাকা
- সমাধিস্থল
- গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রাঙ্গণ, সাভার
- পিতা / মাতা
- হুমায়ুন মোর্শেদ চৌধুরী / হাসিনা বেগম চৌধুরী
- স্ত্রী
- শিরীন হক
- সন্তান
- বরিষ হাসান চৌধুরী (পুত্র), বৃষ্টি চৌধুরী (কন্যা)
- শিক্ষা
- মাধ্যমিক: নবকুমার ইনস্টিটিউশন, বকশিবাজার, ঢাকা / উচ্চমাধ্যমিক: ঢাকা কলেজ / MBBS: ঢাকা মেডিকেল কলেজ (১৯৬৪) / উচ্চশিক্ষা: FRCS (প্রাথমিক পাস, ১৯৭০), রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস, লন্ডন (চূড়ান্ত পরীক্ষা না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ)
- পুরস্কার ও সম্মাননা
- স্বাধীনতা পুরস্কার ১৯৭৭ (জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ) / রামোন ম্যাগসেসে পুরস্কার ১৯৮৫ (ফিলিপাইন) / Right Livelihood Award ১৯৯২ (সুইডেন — বিকল্প নোবেল) / International Health Hero Award, UC Berkeley ২০১০ / স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬ মরণোত্তর (সমাজসেবা)
format_list_bulleted সূচিপত্র expand_more
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার কয়েপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হুমায়ুন মোর্শেদ চৌধুরী এবং মাতার নাম হাসিনা বেগম চৌধুরী। তাঁর পিতা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। দশ ভাইবোনের মধ্যে জাফরুল্লাহ ছিলেন সবার বড়। শৈশব কেটেছে কলকাতায়, কারণ পিতা সেখানে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) এসে স্থায়ী হয়।[ref]
শিক্ষাজীবন ও ছাত্ররাজনীতি
জাফরুল্লাহ চৌধুরী ঢাকার বকশিবাজারের নবকুমার ইনস্টিটিউশনে মাধ্যমিক শিক্ষা এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৬৪ সালে MBBS ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াকালীন তিনি বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে হাসপাতালের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাহসিকতার সাথে সংবাদ সম্মেলন করেন। ১৯৬৪ সালে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং ১৯৭০ সালে রয়্যাল কলেজ অব সার্জনসের প্রাথমিক FRCS পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চূড়ান্ত পরীক্ষা না দিয়েই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ — লন্ডন থেকে রণাঙ্গনে
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে লন্ডনে থাকা জাফরুল্লাহ চৌধুরী মুজিবনগর সরকারের জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং ব্রিটিশ জনগণ ও আইনপ্রণেতাদের মধ্যে সমর্থন আদায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। লন্ডনে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালি শরণার্থীদের জন্য ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করেন। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ড. মোবিনকে নিয়ে ত্রিপুরার আগরতলায় পৌঁছে ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের সাথে যোগ দেন। ত্রিপুরার মেলাঘরে তাঁদের উদ্যোগে ৪৮০ শয্যার বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপিত হয়। হাসপাতালে কোনো পূর্ব চিকিৎসাপ্রশিক্ষণহীন নারীদের মাত্র কয়েক দিনে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্যারামেডিক হিসেবে কাজে লাগানো হয় — এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মূল দর্শনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।[ref]
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা — বঙ্গবন্ধুর দেওয়া নাম
স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের ফিল্ড হাসপাতালকে ১৯৭২ সালের শেষ রবিবার সাভারে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র-এ রূপান্তরিত করা হয়। নামকরণের পেছনে একটি সুন্দর গল্প আছে। সরকার হাসপাতালের পুনরায় চালু হওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানালে হতাশ জাফরুল্লাহ সরাসরি বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে বলেন, "মুজিব ভাই, তারা আমাদের ফিল্ড হাসপাতাল চালু করতে দিচ্ছে না।" বঙ্গবন্ধু নিজেই প্রতিষ্ঠানটির নাম "গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র" রাখেন। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিচালিত হয় "গ্রামে যাও, গ্রাম গড়ো" মূলমন্ত্রে। স্বেচ্ছাসেবীরা গ্রামে গিয়ে বাস করেন, গ্রামবাসীদের সাথে মিলে কার্যক্রম ঠিক করেন। বর্তমানে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সাতটি হাসপাতাল ও পঞ্চাশটি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে সারা দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে।[ref]
নারী প্যারামেডিক বিপ্লব ও The Lancet
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ছিল বাংলাদেশে প্যারামেডিক ধারণার পথিকৃৎ ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার এই মডেল গ্রহণ করে। চিকিৎসাপ্রশিক্ষণহীন নারীদের কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রশিক্ষিত করার এই মডেল ১৯৭৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা জার্নাল The Lancet-এ প্রকাশিত হয় ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে The Lancet-এর কভার আর্টিকেল হিসেবে প্রকাশিত প্রথম গবেষণাপত্র এটি।
জাতীয় ওষুধনীতি ১৯৮২ — বৈশ্বিক পরিবর্তনের সূচনা
১৯৮২ সালে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রণীত বাংলাদেশ জাতীয় ওষুধনীতি দেশের ওষুধশিল্পে বিপ্লব আনে। আন্তর্জাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের গ্রামীণ দরিদ্রদের নাগালের বাইরে ওষুধের দাম রাখছে দেখে তিনি নিজেই জেনেরিক ওষুধ কোম্পানি তৈরি করেন — যা ওষুধের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। তিনি WHO-কে প্রভাবিত করেন, যা ১৯৭৭ সালে প্রথমবার Essential Medicines List প্রকাশ করে। তাঁর এই অবদান সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলেন — তিনিই ছিলেন এই বৈশ্বিক ঘটনার (essential drugs ধারণার) পথিকৃৎ।
গ্রামীণ স্বাস্থ্য বীমা ও শিক্ষা
১৯৭৩ সালে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র বাংলাদেশে প্রথম গ্রামীণ স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা চালু করে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ব্যাপক — গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র সাভারে গণো বিশ্ববিদ্যালয় (Gono Bishwabidyalay), কারিগরি মহাবিদ্যালয়, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং ১৮৭টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে।.
আলমা-আটা ঘোষণা ও বৈশ্বিক প্রভাব
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবার ধারণা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিখ্যাত আলমা-আটা ঘোষণার (১৯৭৮) অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। তিনি ২০০০ সালের People's Health Assembly আয়োজনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
সামাজিক ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা
স্বাস্থ্যসেবার বাইরেও জাফরুল্লাহ চৌধুরী সারাজীবন মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে লড়াই করেছেন। তিনি ভাসানী অনুসারী পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন এবং ২০১৮ সালে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে গঠিত জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের সাথে যুক্ত হন।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
জাফরুল্লাহ চৌধুরী দীর্ঘদিন কিডনি রোগ, সেপটিসিমিয়া ও যকৃতের সমস্যায় ভুগছিলেন। COVID-19 আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল নিজের প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ১১ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে ৮১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়।[ref]
পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
১৯৭৭ সালে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে ফিলিপাইনের রামোন ম্যাগসেসে পুরস্কার এবং ১৯৯২ সালে সুইডেনের Right Livelihood Award (বিকল্প নোবেল) পান। ২০১০ সালে আমেরিকার ইউসি বার্কলে থেকে International Health Hero Award পান। মৃত্যুর পর ২০২৬ সালে সমাজসেবা ক্ষেত্রে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়।
রচনাবলি
জাফরুল্লাহ চৌধুরী রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: The Politics of Essential Drugs (বৈশ্বিক ওষুধনীতি নিয়ে মূল্যবান রচনা), এবং Achieving the Millennium Development Goal on Maternal Mortality: Gonoshasthaya Kendra's Experience in Rural Bangladesh (২০০৭)।[ref]